দেশের অ্যাভিয়েশন বা বিমান খাতকে ঢেলে সাজাতে একটি বড় ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জাতীয় পতাকাবাহী বিমান পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে এক ধাক্কায় ১৪টি নতুন ও অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সই করেছে। বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে রাত ৯টার দিকে রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠানে এই বিশাল চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
এই ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে বাংলাদেশ সরকারের মোট খরচ পড়বে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার বা ৩৭০ কোটি ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় বর্তমান বাজারদরে প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকার সমান (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৩ পয়সা ধরে)। বিমানের ইতিহাসে এর আগে এত বড় অঙ্কের কোনো ক্রয়চুক্তি কখনো হয়নি। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিমানের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাইজার সোহেল আহমেদ এবং বোয়িংয়ের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিগি চুক্তিনামায় সই করেন।
চুক্তি অনুযায়ী বোয়িং যে ১৪টি উড়োজাহাজ সরবরাহ করবে, তার মধ্যে ১০টি হলো ওয়াইড-বডির ‘৭৮৭ ড্রিমলাইনার’ এবং বাকি ৪টি হলো ছোট বা ন্যারো-বডির ‘৭৩৭ ম্যাক্স’ মডেলের উড়োজাহাজ। বোয়িংয়ের সাথে এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ পৃথিবীর সেই অল্প কয়েকটি দেশের তালিকায় ঢুকে গেল, যাদের বহরে ৭৮৭ ড্রিমলাইনার সিরিজের সব কটি মডেল (৭৮৭-৮, ৭৮৭-৯ এবং ৭৮৭-১০) থাকবে। চুক্তি মোতাবেক, ২০৩১ সালের অক্টোবর মাসে বোয়িং তাদের প্রথম উড়োজাহাজটি বিমানের কাছে হস্তান্তর করবে এবং এরপর ধাপে ধাপে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাকি সবগুলো উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যুক্ত হবে।
অনুষ্ঠানে বিমানের সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ জানান, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এসব উড়োজাহাজ আগেরগুলোর চেয়ে অন্তত ২০% বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী। এগুলো বিমানের বর্তমান বহরকে অনেক বেশি আধুনিক করবে এবং আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের নেটওয়ার্ক বাড়াতে দারুণ সাহায্য করবে। তিনি আরও বলেন, এই চুক্তি দেশের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিগি বলেন, এই চুক্তি দুই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করল। নতুন এই ড্রিমলাইনারগুলো মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার দীর্ঘ দূরত্বের লাভজনক রুটগুলোতে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহৃত হবে।
বিমান কেনার এই প্রক্রিয়াটি বেশ পুরোনো। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মাহবুবুর রহমান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানিয়েছিলেন। তবে সে সময় বিমান কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কিছু জানত না বলে গণমাধ্যমে খবর বেরোয়। এর আগে বিগত সরকারের আমলে ১০টি এয়ারবাস কেনার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক শুল্ক বা ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ চুক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত বোয়িংয়ের পাল্লাই ভারী হয়।
বিশাল এই ক্রয়চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক বিমানকে একটি বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা দিচ্ছে। ফলে বিমানের ওপর একবারে বড় ধরনের কোনো আর্থিক চাপ পড়বে না, বরং কিস্তিতে টাকা পরিশোধের সুযোগ থাকবে। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনসহ সরকারের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
















