খেলার স্কোরলাইন তখন ১-১ গোলে সমতায়। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতে বাকি আর মাত্র তিন মিনিট। ডাগআউটে বসে থাকা সবার চোখেমুখে চরম উত্তেজনা। ঠিক এমন স্নায়ুচাপের মুহূর্তেই জাদুর কাঠি হাতে মাঠে হাজির হলেন বাংলাদেশের আইরিন আক্তার। ম্যাচের ৫৭ ও ৫৮ মিনিটে পরপর দুটি দুর্দান্ত গোল করে তিনি পুরো দলের চেহারা এক নিমিষেই বদলে দেন। সিঙ্গাপুরকে ৩-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশ নারী হকি দল এশিয়ান গেমসের বাছাইপর্বের ফাইনালে নিজেদের জায়গা পাকা করেছে। এই ম্যাচে দলের হয়ে তিনটি গোলই একাই করেছেন আইরিন।
ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় জিবিকে হকি মাঠে আজ প্রথম তিন কোয়ার্টারে সিঙ্গাপুর বেশ ভালোই ভুগিয়েছে বাংলাদেশকে। বিশ্ব হকির র্যাঙ্কিংয়ে সিঙ্গাপুরের বর্তমান অবস্থান ৩৬ নম্বরে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এমন শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ম্যাচের দশম মিনিটেই আইরিন আক্তারের চমৎকার ফিল্ড গোলে বাংলাদেশ প্রথমে লিড নেয়। কিন্তু মেয়েদের এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাত্র দুই মিনিট পরেই পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করে সিঙ্গাপুরকে দ্রুত সমতায় ফেরান তাদের খেলোয়াড় চিয়া চেরি। এরপর মাঠে শুরু হয় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।
গোল হজম করার পর বাংলাদেশের মেয়েরা মাঠে কিছুটা সতর্ক হয়ে খেলতে শুরু করে। তারা রক্ষণভাগ সামলে আক্রমণের ধার বাড়ায়। ১৭ মিনিটের মাথায় বাংলাদেশ একটি পেনাল্টি কর্নার পায়। কিন্তু নাদিরা সুযোগটি কাজে লাগিয়ে গোল করতে ব্যর্থ হন। ফলে ১-১ গোলের সমতা নিয়েই শেষ হয় খেলার দ্বিতীয় কোয়ার্টার। তৃতীয় কোয়ার্টারেও বাংলাদেশের মেয়েরা বারবার সিঙ্গাপুরের গোলমুখে ভয়ংকর আক্রমণ চালিয়েছে। ৪২ মিনিটে বাংলাদেশ দ্বিতীয় পেনাল্টি কর্নার পায়, তবে দলের অধিনায়ক অর্পিতা পাল এবারও গোল করতে পারেননি। ৪৫ মিনিটে শারিকার জোরালো হিট প্রতিপক্ষ গোলকিপার ইলিয়া আটকে দেন।
১-১ সমতা নিয়ে শেষ কোয়ার্টারের খেলা শুরু হলে মাঠের পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুই দলই তখন জয়সূচক গোল পাওয়ার জন্য মরিয়া। ৪৭ ও ৪৮ মিনিটে বাংলাদেশ পরপর দুটি পেনাল্টি কর্নার পেলেও বল জালে জড়াতে পারেনি। তবে কোচ জাহিদ হোসেনের শিষ্যরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল ছাড়েননি। ম্যাচের ৫৭ মিনিটে কনা আক্তারের দারুণ এক পাস থেকে নিখুঁত ফিল্ড গোল করে দলকে আবারও এগিয়ে নেন আইরিন। ঠিক এক মিনিট পর ৫৮ মিনিটে আরেকটি দর্শনীয় ফিল্ড গোল করে আইরিন নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এবং জয় নিশ্চিত করেন।
বাংলাদেশ নারী হকি দলের জন্য এটিই জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। নিজেদের প্রথম আসরেই তারা মাঠে দারুণ চমক দেখিয়ে পুরো হকি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। গত রোববার শক্তিশালী হংকং চায়নাকে হারিয়ে তারা প্রথমবারের মতো মূল এশিয়ান গেমসে খেলা নিশ্চিত করেছিল। আজ অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে পেল বাছাইপর্বের ফাইনালের টিকিট। বাছাইপর্বের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আজ সন্ধ্যায় স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার মুখোমুখি হবে চায়নিজ তাইপে। এই ম্যাচে যারা জিতবে, আগামীকালের গ্র্যান্ড ফাইনালে বাংলাদেশের মেয়েরা সরাসরি তাদের বিপক্ষেই মাঠে নামবে।
আমাদের দেশের ক্রীড়াঙ্গনের দিকে তাকালে দেখা যায়, মোট বাজেটের প্রায় ৯০% অর্থই খরচ হয় শুধু ক্রিকেটের পেছনে। সেখানে বিভিন্ন স্পনসররা প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অনায়াসেবিনিয়োগকরেন।অন্যদিকে নারী হকিদলের মেয়েরা খুবসামান্য সুযোগ−সুবিধানিয়েই নিজেদের লড়াইচালিয়ে যান।অনেক সময় বিদেশ সফরে যাওয়ার আগেতাদের কাছে(৫,০০০)অনায়াসে বিনিয়োগকরেন।অন্যদিকে নারী হকিদলের মেয়েরা খুবসামান্য সুযোগ−সুবিধানিয়েই নিজেদের লড়াইচালিয়ে যান।অনেক সময় বিদেশসফরে যাওয়ার আগেতাদের কাছে৫,০০০ থেকে ১০,০০০$ ডলারের মতো সাধারণ খরচ মেটানোর টাকাও থাকে না। কিন্তু এতসব আর্থিক বাধা সত্ত্বেও অদম্য এই মেয়েরা দেশের জন্য বিশাল সম্মান বয়ে আনছেন।
ছেলেদের জাতীয় হকি দল এশিয়ান গেমসের বাছাইপর্বে এ পর্যন্ত মোট চারবার ফাইনাল খেলে দুবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এবার মেয়েরাও তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নেমেই একই গৌরবের পথে বীরদর্পে হাঁটছেন। পুরো দেশ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ফাইনালে মেয়েরা যদি নিজেদের এই ১০০% সাফল্যের ধারা ধরে রাখতে পারে, তবে তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েই দেশে ফিরবে। মেয়েদের এই অবিস্মরণীয় জয় দেশের হকিতে নতুন এক যুগের সূচনা করবে।
















