ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার কৃষি এখন এক চরম সংকটকাল পার করছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব এবং তার সাথে তীব্র জ্বালানি বা ডিজেল সংকটের কারণে প্রান্তিক কৃষকের কপালে এখন চিন্তার গাঢ় ভাঁজ পড়েছে। যত্রতত্র ডিজেল না পাওয়ায় মাঠে সেচ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানির অভাবে উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এখন রৌদ্রে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে নিজেদের সন্তানের মতো লালন করা ধানের জমি শুকিয়ে যেতে দেখে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এলাকার সাধারণ কৃষকেরা।
কৃষকদের এখন প্রতিদিনের প্রধান যুদ্ধ হলো মেশিনের জন্য তেল জোগাড় করা। তাদের অভিযোগ, গ্রাম থেকে ভ্যান বা সাইকেলে করে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফিলিং স্টেশনে গিয়েও কাঙ্ক্ষিত ডিজেল মিলছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের ভাগ্যে জুটছে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল। বর্তমান বাজারে যার মান প্রায় ৪ থেকে ৫ ডলার (৪−৪−৫)। শ্যালো মেশিন দিয়ে এই সামান্য তেল পুড়িয়ে এক বিঘার এক বেলার সেচ কাজও ঠিকমতো সম্পন্ন করা যায় না। বারবার তেল আনতে গিয়ে একদিকে যেমন কৃষকের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে যাতায়াত খরচ বেড়ে গিয়ে পুরো চাষাবাদের খরচ একেবারে আকাশচুম্বী হয়ে পড়ছে।
গ্রামের কৃষিতে একটা সময় ধারে কেনাকাটার খুব সুন্দর একটি রেওয়াজ ছিল। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কৃষকেরা খুব সহজেই ধারে বা বাকিতে সার ও ডিজেল নিতে পারতেন। ফসল কাটার পর তা বিক্রি করে তারা সেই ধারের টাকা খুশিমনে পরিশোধ করতেন। গ্রামের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ক্ষুদ্র কৃষক সরাসরি এই বাকি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে নিজেদের চাষাবাদ করতেন। কিন্তু বর্তমানে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং অস্থিতিশীল বাজার পরিস্থিতির কারণে ডিলার ও ব্যবসায়ীরা আর আগের মতো সেই বাকির সুবিধা দিচ্ছেন না। নগদ টাকার চরম অভাবে অনেক প্রান্তিক কৃষক এখন বাধ্য হয়ে মাঝপথে চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
সেচের পানির অভাবে আবাদি জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। সেচনির্ভর ফসলের জন্য এই সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিকমতো পানি না দিতে পারলে ধানের ফলন অন্তত ৩০% থেকে ৪০% কমে যাওয়ার বড় ধরনের আশঙ্কা থাকে। মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা হতাশা নিয়ে বলছেন, দ্রুত এই জ্বালানি তেলের সমস্যার সমাধান না হলে তারা আর্থিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যাবেন এবং আরও দরিদ্রসীমার নিচে চলে যাবেন। উৎপাদন কমে গেলে শুধু কৃষকেরই ক্ষতি হবে না, এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো দেশের সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহের ওপর। বাজারে খাদ্যশস্যের দাম তখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
শৈলকুপার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাঠে গেলে কৃষকদের এই অসহায় ও করুণ অবস্থা খুব সহজেই চোখে পড়ে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে কৃষক দেশের মানুষের জন্য অন্ন জোগান দেন, আজ তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন। তেলের জন্য প্রতিদিন তাদের যে যুদ্ধ করতে হচ্ছে, তা একজন সাধারণ মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এলাকার অনেক কৃষক এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ১০% থেকে ২০% লাভে জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করেছেন। এখন পানির অভাবে সেই ফসল নষ্ট হলে ঋণের দায়ে তাদের আক্ষরিক অর্থেই পথে বসতে হবে। তাই কৃষকদের চোখে এখন কেবলই হতাশা আর ভবিষ্যতের চরম অনিশ্চয়তা।
এমন ভয়াবহ ও হতাশাজনক পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে প্রান্তিক কৃষকদের একটাই আকুল আবেদন। তারা চান, স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করে জ্বালানি সরবরাহের চেইন স্বাভাবিক করুক। ডিলারের মাধ্যমে সরাসরি গ্রামে গ্রামে বা ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে কৃষকদের আর পাম্পে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হয়রানির শিকার হতে হবে না। কৃষি ও কৃষক বাঁচলে তবেই দেশ বাঁচবে। তাই দেশে বড় ধরনের কোনো খাদ্য সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কৃষকের এই সমস্যার একটি দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে।
















