ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রাম আদালত নিয়ে ভিডিও প্রদর্শনী: তৃণমূলে বাড়ছে আইনি সচেতনতা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গ্রামের সাধারণ মানুষের ছোটখাটো বিরোধ বা পারিবারিক ঝগড়া মেটাতে জেলা শহরের আদালতে গিয়ে মামলার পেছনে ঘোরার দিন হয়তো এবার ফুরোচ্ছে। কারণ, নিজেদের হাতের নাগালেই যে খুব সহজে ও একদম কম খরচে ন্যায়বিচার পাওয়া যায়, সে কথা এখন তৃণমূলের প্রান্তিক মানুষ জানতে শুরু করেছেন। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে গ্রাম আদালত সম্পর্কে সঠিক সচেতনতা বাড়াতে ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি চমৎকার কিছু কমিউনিটি ভিডিও শোর আয়োজন করা হয়েছে। ‘বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্পের সরাসরি উদ্যোগে এই ব্যতিক্রমী প্রচারণার কাজ চলছে।

সাধারণত গ্রামের কোনো গরিব কৃষক বা দিনমজুর জমিজমার সীমানা নিয়ে বিরোধ বা পারিবারিক ছোট কোনো সমস্যা নিয়ে জেলা জজ আদালতে গেলে তাদের ভোগান্তির আর কোনো শেষ থাকে না। একটি ছোট মামলার জন্য উকিল ধরা, যাতায়াত এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ মিলিয়ে অনেক সময় ১৫০

থেকে২০০থেকে২০০

 (ডলার) বা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকারও বেশি খরচ হয়ে যায়। মাসের পর মাস ঘুরতে ঘুরতে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। অথচ ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকা গ্রাম আদালতে মাত্র ১০ বা ২০ টাকা ফি জমা দিয়ে খুব দ্রুত নিজেদের সমস্যার সমাধান করা যায়। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটিই সহজবোধ্য ভিডিও প্রদর্শনীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।

প্রকল্পের সাথে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর, দেবীপুর, সেনুয়া, রাজাগাঁও, রুহিয়া, রুহিয়া পশ্চিম, আকচা, নারগুন এবং বেগুনবাড়ী ইউনিয়নে ধারাবাহিকভাবে এই ভিডিও শোগুলো অনুষ্ঠিত হয়। দিনের বেলা গ্রামের মানুষ নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকেন বলে সাধারণত পড়ন্ত বিকেলে বা সন্ধ্যায় গ্রামের খোলা মাঠে বড় পর্দার মাধ্যমে এসব ভিডিও দেখানো হয়। এতে প্রায় ৩,০০০ গ্রামীণ নারী, পুরুষ ও বয়স্ক মানুষ অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। ভিডিওর নাটিকা ও গল্পের মাধ্যমে তারা খুব সহজেই গ্রাম আদালতের কাজের ধরন, বিচার পাওয়ার সুবিধা এবং সেখানে কীভাবে আবেদন করতে হয় সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করেন।

এই প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি সাড়া পাওয়া গেছে সালন্দর ইউনিয়নের কারাম মন্দির এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে। এই এলাকায় মূলত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বেশি। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা এবং সহজ-সরল এই আদিবাসী মানুষগুলো সাধারণত আইনি ঝামেলা বা মামলার ভয়ে সবসময় গুটিয়ে থাকেন। ভিডিও প্রদর্শনী শেষে এই আদিবাসী কমিউনিটির অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করে জানান, তারা জীবনে প্রথমবারের মতো গ্রাম আদালতের এই সহজ সেবার কথা বিস্তারিত জানতে পেরেছেন। এখন থেকে এলাকার ছোটখাটো কোনো ঝামেলা হলে তারা আর পুলিশ বা দালালদের ভয় পেয়ে বসে থাকবেন না, বরং সরাসরি গ্রাম আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার চাইবেন।

আইন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, গ্রামের প্রায় ৮০% থেকে ৯০% ছোটখাটো বিরোধ, ফসলের ক্ষতি বা মারামারির ঘটনা স্থানীয়ভাবেই মেটানো সম্ভব। গ্রাম আদালতের বিচারিক প্যানেলে মূলত স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মেম্বাররা থাকেন, যাদের গ্রামের মানুষ খুব ভালো করেই চেনেন। এই আদালতের মাধ্যমে বিচার হলে কোনো পক্ষেরই খুব একটা টাকা খরচ হয় না। তাছাড়া উভয় পক্ষের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে এবং সম্মতির ভিত্তিতে রায় দেওয়া হয় বলে বিচার শেষে এলাকার মানুষের মধ্যে সম্পর্কও ভালো থাকে। ভিডিওতে দেখানো এমন কিছু বাস্তব উদাহরণ সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তারা এখন বুঝতে পারছেন যে, নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দালালদের পেছনে নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তৃণমূলের মানুষের মাঝে এমন ব্যাপক সাড়া দেখে তারা নিজেদের কাজের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। গ্রাম আদালতকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও বেশি কার্যকর ও জনপ্রিয় করে তুলতে আগামীতেও এই ধরনের কমিউনিটি ভিডিও শো এবং সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। এমন সহজ ও সময়োপযোগী উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের জন্য খুব দ্রুত ও নামমাত্র খরচে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথ সামনে আরও সুগম হবে বলে সবাই দৃঢ়ভাবে আশা করছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ