ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ
করছে। জমি কেনাবেচার মতো একটি সাধারণ কাজ করতে গিয়ে এখন স্থানীয় মানুষ ও
দলিল লেখকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের একটি নতুন ফন্দি
তৈরি করেছে এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং দলিল
লেখকেরা জানান, ফারুক, আজিজুল লস্কর, খায়রুল ও মশিয়ার নামের কয়েকজন ব্যক্তি হঠাৎ
করেই নিজেদের মতো করে একটি কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো
দলিলপ্রতি একটি নির্দিষ্ট হারে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা। তাদের এই বেআইনি
সিদ্ধান্তের কারণেই পুরো এলাকায় এখন চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তিরা চাঁদা আদায়ের জন্য একটি অদ্ভুত ও অন্যায় নিয়ম চালু করার চেষ্টা
করছেন। তারা প্রস্তাব দিয়েছেন যে, এখন থেকে প্রতি ১ লাখ টাকার জমি কেনাবেচায়
তাদেরকে ২ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হবে। ডলারের হিসাবে এই টাকার পরিমাণ
প্রায় ১৮$ ডলারের কাছাকাছি। এর বাইরে কেউ যদি নিজের আত্মীয়দের জমি দান বা
হেবা দলিল করে দেন, তবে সেখানেও অতিরিক্ত ২ হাজার টাকা চাঁদা গুণতে হবে। চাঁদার
এই জুলুম এখানেই শেষ নয়। তারা ইউনিয়ন পর্যায়ের জমির জন্য প্রতি শতকে ১০০ টাকা এবং
পৌরসভা এলাকার জমির জন্য প্রতি শতকে ২০০ টাকা হারে চাঁদা ধার্য করেছেন। এই
বিপুল পরিমাণ টাকার চাপ সরাসরি সাধারণ ক্রেতা ও বিক্রেতার ঘাড়েই পড়বে।
এই নতুন নিয়ম চালুর জন্য গত রবিবার একটি বিশেষ বৈঠকের ডাক দিয়েছিলেন ওই অভিযুক্ত
ব্যক্তিরা। কিন্তু সাধারণ দলিল লেখকেরা অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তাদের
এই ডাকে একদমই সাড়া দেননি। কেউ বৈঠকে না যাওয়ায় ফারুক, আজিজুল ও তাদের সহযোগীরা
প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা প্রকাশ্যে নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা
হিসেবে দাবি করেন। তারা হুমকি দিয়ে বলেন যে, তাদের নেওয়াই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং
সবাইকে সেটা মেনে নিতে হবে। শুধু হুমকি দিয়েই তারা থেমে থাকেননি, বাইরে থেকে অচেনা
সন্ত্রাসীদের ভাড়ায় এনে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এলাকায় অবাধে ঘোরার সুযোগ করে
দিয়েছেন। এর ফলে সেখানে আসা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি
হয়েছে।
আমাদের সমাজে মানুষ সাধারণত শখে জমি বিক্রি করেন না। অর্থনীতিবিদদের মতে, জমি
বিক্রির প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনাই ঘটে মানুষের চরম বিপদের সময়। কেউ
মেয়ের বিয়ে দিতে, কেউ চিকিৎসার বিল মেটাতে, আবার কেউ হয়তো বিদেশে যাওয়ার
জন্য শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করেন। এমন অসহায় অবস্থায় যদি জমির দামের ওপর
অতিরিক্ত ৫% বা তার বেশি টাকা শুধু চাঁদা হিসেবেই দিতে হয়, তবে ওই
পরিবারগুলো পুরোপুরি পথে বসে যাবে। একটি সাধারণ হেবা দলিল করতেও যদি
মানুষকে এমন হয়রানির শিকার হতে হয়, তবে আইনের প্রতি মানুষের কোনো
শ্রদ্ধাই আর অবশিষ্ট থাকবে না।
এলাকার সাধারণ দলিল লেখকেরা এই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এবার শক্ত অবস্থান নিয়েছেন।
তারা যেকোনো মূল্যে এই অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কয়েকজন দলিল
লেখক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি অসহায় ও গরিব মানুষের ওপর সরাসরি জুলুম।
যারা একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে নিজেদের শেষ জমিটুকু বিক্রি করতে বা রেজিস্ট্রি
করতে আসেন, তাদের ওপর এমন আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা চরম অন্যায়। তারা স্পষ্টভাবে
জানিয়ে দিয়েছেন যে, গুটিকয়েক সন্ত্রাসীর পকেট ভারী করার জন্য তারা আর সাধারণ
মানুষের পকেট কাটতে দেবেন না।
দলিল লেখকদের একটি বড় অংশ এখন পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ। তারা এই অনৈতিক চাঁদাবাজির
বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রয়োজনে তারা প্রশাসনের কাছে যাবেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে
কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেবেন। এখন কালীগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও দলিল লেখকেরা
প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তারা চান পুলিশ ও প্রশাসন
দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের তাড়িয়ে
দিক, যাতে মানুষ আবার নির্ভয়ে তাদের জমির কাজকর্ম করতে পারেন।
















