মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো চিকিৎসাসেবা বা স্বাস্থ্যসেবা।
একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতিই পারে দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে। বাংলাদেশের
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শান্ত ও ছিমছাম জেলা ঝিনাইদহ দীর্ঘদিন ধরেই নানামুখী
সমস্যায় জর্জরিত ছিল, যার মধ্যে স্বাস্থ্য খাত অন্যতম। একসময় ঝিনাইদহের
সাধারণ মানুষকে সামান্য একটু উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা, ফরিদপুর বা
রাজধানী ঢাকায় ছুটতে হতো। এতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ও
মানসিক কষ্টের কোনো সীমা থাকত না। তবে অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো,
ঝিনাইদহের এই স্বাস্থ্য খাতে এখন পরিবর্তনের নতুন হাওয়া বইতে শুরু
করেছে। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সরকার
সম্প্রতি বেশ কিছু নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের সফল
বাস্তবায়ন ঝিনাইদহবাসীর মনে এক নতুন আশার আলো ও ভরসা জাগিয়েছে।
অতীত ও বর্তমান স্বাস্থ্যসেবার চিত্র
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্সগুলোর অবস্থা ছিল বেশ করুণ। অপরিষ্কার
পরিবেশ, রোগীর তুলনায় শয্যার তীব্র অভাব, মেঝেতে শুয়ে থাকা মুমূর্ষু
রোগী আর দালালদের দৌরাত্ম্য—এসবই ছিল সরকারি হাসপাতালগুলোর নিত্যদিনের চিত্র।
রোগ নির্ণয়ের জন্য দরকারি মেশিনগুলো প্রায়ই নষ্ট থাকত, ফলে বাধ্য হয়ে রোগীদের
বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে চড়া মূল্যে
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হতো। কিন্তু এখন সেই পুরনো চিত্রে অনেক বদল
এসেছে। হাসপাতালগুলোর পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন
ও সুশৃঙ্খল হয়েছে। নতুন করে বেশ কিছু শয্যা বা বেড বাড়ানো হয়েছে, যাতে রোগীদের আর
বারান্দায় বা মেঝেতে কষ্ট করে থাকতে না হয়। সরকারি হাসপাতালের প্রতি সাধারণ মানুষের
সেই হারিয়ে যাওয়া আস্থা যেন ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নতুন ভবনের নির্মাণ
স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে সবচেয়ে আগে দরকার উন্নত ও টেকসই অবকাঠামো। সরকারের নতুন
প্রকল্পের আওতায় ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্সগুলোতে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
এসব ভবনে আলো-বাতাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার
নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগীদের জন্য জরুরি বিভাগকে আরও আধুনিক ও
প্রশস্ত করা হয়েছে। আগে যেখানে একটি ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে রোগীদের প্রাথমিক
চিকিৎসা দেওয়া হতো, সেখানে এখন আলাদা আলাদা সুপরিসর ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অবকাঠামোগত এই বিশাল উন্নয়নের ফলে হাসপাতালে আসা রোগীরা এবং তাদের স্বজনরা এখন
অনেকটাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারছেন।
আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির সংযোজন
শুধু সুন্দর ভবন থাকলেই তো আর চিকিৎসা হয় না, নির্ভুল চিকিৎসার জন্য দরকার আধুনিক
যন্ত্রপাতি। ঝিনাইদহের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন নতুন ও আধুনিক সব চিকিৎসা
সরঞ্জাম সংযোজন করা হচ্ছে। অত্যন্ত আশার কথা হলো, সরকারি উদ্যোগেই আইসিইউ
(ICU) এবং কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো অত্যন্ত জরুরি সেবা চালু করার
পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা একসময় এই শহরের মানুষের কাছে স্বপ্ন ছিল। ডিজিটাল এক্স-রে
মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং আধুনিক ইসিজি মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে গ্রামের
গরিব মানুষদের আর বেশি টাকা খরচ করে শহরের দামি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে না। সরকারি
হাসপাতালেই তারা নামমাত্র মূল্যে এসব উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে পারছেন,
যা তাদের আর্থিকভাবে দারুণ সুরক্ষা দিচ্ছে।
চিকিৎসক ও জনবল সংকট নিরসনে পদক্ষেপ
স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় অভিযোগটি থাকে চিকিৎসক ও নার্স সংকট নিয়ে। অনেক সময়
আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও তা চালানোর মতো দক্ষ টেকনিশিয়ান বা বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসক পাওয়া যেত না। সরকারের নতুন প্রকল্পের অধীনে এই চিকিৎসক ও জনবল সংকট
দূর করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া অনেক মেধাবী ও তরুণ
চিকিৎসককে ঝিনাইদহের বিভিন্ন হাসপাতালে পদায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি,
চিকিৎসকরা যেন কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন, সে ব্যাপারেও কড়া নজরদারি
বাড়ানো হয়েছে। নার্স, ওয়ার্ড বয় ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাও
বাড়ানো হচ্ছে, যাতে রোগীদের সেবায় কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে। চিকিৎসকদের এই
আন্তরিক সেবা রোগীদের মনে নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস জোগাচ্ছে।
মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যে বিশেষ নজর
একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম বড় সূচক হলো মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমানো।
ঝিনাইদহে সরকারের নতুন স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলোতে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের ওপর আলাদা
ও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গর্ভবতী মায়েদের নিরাপদ প্রসবের জন্য আধুনিক লেবার
ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যার জন্য ‘স্ক্যানু’
(SCANU) বা বিশেষায়িত নবজাতক সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। ফলে জন্মগত জটিলতা বা
অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া শিশুদের জীবন বাঁচানো আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে।
গ্রামের সাধারণ নারীরা এখন গর্ভকালীন নানা সমস্যা নিয়ে বিনা সংকোচে
হাসপাতালে আসছেন এবং সঠিক পরামর্শ ও বিনামূল্যে সরকারি ওষুধ পাচ্ছেন।
দালালমুক্ত পরিবেশ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অন্যতম প্রধান কারণ হলো দালাল
চক্রের দৌরাত্ম্য। গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল মানুষদের ভুল বুঝিয়ে প্রাইভেট
ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার এই অপতৎপরতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল। তবে বর্তমান প্রশাসন ও
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির কারণে দালালদের সেই দাপট অনেকটাই কমে এসেছে।
সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে হাসপাতালের ভেতরে একটি
নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তবে শুধু প্রশাসন কঠোর হলেই হবে না, সেবার
মান ধরে রাখতে হলে চিকিৎসক থেকে শুরু করে হাসপাতালের প্রতিটি কর্মীর জবাবদিহিতা
নিশ্চিত করতে হবে। কোনো মেশিন নষ্ট হলে তা দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে
সাধারণ রোগীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত না হন।
উপসংহার
ঝিনাইদহে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে সরকারের এই নতুন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন
নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের
কাছে সরকারি হাসপাতাল ছাড়া চিকিৎসার আর কোনো বিকল্প উপায় নেই, তাদের জন্য এই
পরিবর্তনগুলো এক বিশাল আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার
কারণে মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে আমাদের মনে রাখতে
হবে, কেবল সরকারি উদ্যোগই রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। আমাদের
সাধারণ নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। হাসপাতালের নিয়মকানুন মেনে চলা,
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সরকারি সম্পদের সঠিক
ব্যবহার নিশ্চিত করা আমাদের সবার সমান দায়িত্ব। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, চিকিৎসকদের
আন্তরিকতা এবং নাগরিকদের সচেতনতা—এই তিনের সমন্বয়ে ঝিনাইদহের স্বাস্থ্য খাত অচিরেই
পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি অনুকরণীয় রোল মডেল হয়ে উঠবে। সবার জন্য সুস্বাস্থ্য
নিশ্চিত করার এই যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে, তা যেন সফলতার মুখ দেখে, সেটাই
আমাদের প্রত্যাশা।
















