উন্নয়নের ধারায় বৈষম্য কেন বাড়ছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

আমরা যদি আমাদের চারপাশের দিকে তাকাই, তাহলে উন্নয়নের অনেক দৃশ্য চোখে পড়ে। বড় বড়
ফ্লাইওভার, দিগন্ত বিস্তৃত মহাসড়ক, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল কিংবা কর্ণফুলী
টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো আমাদের মনে দেশের অগ্রগতি সম্পর্কে এক
ধরনের গর্বের জন্ম দেয়। খবরের কাগজে বা টেলিভিশনের পর্দায় আমরা প্রায়ই দেখি
আমাদের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি (GDP) বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে এবং আমরা
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পথে হাঁটছি। এগুলো
নিঃসন্দেহে একটি জাতির জন্য অনেক বড় অর্জন।

কিন্তু এই উন্নয়নের উজ্জ্বল আলোর ঠিক নিচেই রয়েছে এক গভীর অন্ধকার। রাস্তার মোড়ে
দাঁড়িয়ে থাকা বিলাসবহুল গাড়ির পাশেই দেখা যায় ক্ষুধার্ত মানুষের হাত পাতা।
শহরের বড় বড় শপিংমলগুলোতে যখন উপচে পড়া ভিড়, তখন বাজারের সাধারণ মুদি দোকানে
গিয়ে এক কেজি চাল বা এক ডজন ডিম কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ
পড়ছে। একদিকে একশ্রেণির মানুষের সম্পদ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তারা বিদেশে বাড়ি
কিনছেন; অন্যদিকে আরেক শ্রেণির মানুষ মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসে সংসার চালাতে গিয়ে
হিমশিম খাচ্ছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের এই যে চিত্র, তা আমাদের সামনে
একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—উন্নয়নের ধারায় বৈষম্য কেন এত দ্রুত বাড়ছে? কেন
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না? এই বৈষম্যের
পেছনের কারণগুলো এবং এর প্রভাব নিয়ে আজ আমাদের গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা
প্রয়োজন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

উন্নয়নের চাকচিক্য বনাম বাস্তব চিত্র

আমাদের অর্থনীতি গত এক দশক বা তার বেশি সময় ধরে বেশ ভালো গতিতে এগিয়েছে। কিন্তু এই
এগিয়ে যাওয়ার ভেতরে এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের চোখে সহজে
ধরা পড়ে না।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি: একটি সংখ্যার বিভ্রম

আমরা প্রায়ই শুনি আমাদের মাথাপিছু আয় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে
এটি শতভাগ সত্যি। কিন্তু মাথাপিছু আয় বের করার নিয়মটি হলো—দেশের মোট আয়কে মোট
জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করা। ধরুন, একটি ঘরে দুজন মানুষ আছেন। একজনের আয় ৯৯
হাজার টাকা এবং আরেকজনের আয় ১ হাজার টাকা। গড়ে তাদের দুজনের মাথাপিছু আয় দাঁড়ায়
৫০ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে ওই ১ হাজার টাকা আয় করা মানুষটির অবস্থা কি
আসলেই ৫০ হাজার টাকার সমান? দেশের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটিই ঘটছে। মুষ্টিমেয়
কিছু অতি ধনী মানুষের আয় এত দ্রুত বেড়েছে যে, তাদের আয়ের কারণে দেশের গড় মাথাপিছু
আয় অনেক বেশি দেখাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে একজন কৃষক, একজন গার্মেন্টস কর্মী বা একজন
সাধারণ চাকরিজীবীর আয় সেভাবে বাড়েনি। ফলে কাগজ-কলমে উন্নয়ন দেখা গেলেও মানুষের
পকেটে সেই উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে না।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৈষম্য বাড়ার মূল কারণগুলো

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

উন্নয়নের সাথে সাথে বৈষম্য বাড়ার এই প্রক্রিয়াটি এক দিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে
আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর কিছু বড় দুর্বলতা এবং বর্তমান বৈশ্বিক ও
অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা দায়ী।

লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়

বর্তমানে বৈষম্য বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো লাগামহীন মূল্যস্ফীতি বা জিনিসপত্রের দাম
বৃদ্ধি। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম, ব্রয়লার মুরগি থেকে শুরু করে প্রতিটি
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর
সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত এবং বাসা ভাড়া। একজন ধনী
মানুষের আয়ের খুব সামান্য অংশ বাজারের পেছনে ব্যয় হয়। চালের দাম
কেজিতে ১০ টাকা বাড়লে একজন কোটিপতির কিছুই যায় আসে না। কিন্তু একজন
দিনমজুর বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর জন্য এই ১০ টাকা বাড়তি খরচ মানে
মাসের শেষে তার সন্তানের দুধ কেনা বন্ধ করে দেওয়া বা নিজের চিকিৎসা খরচ কমিয়ে
দেওয়া। মূল্যস্ফীতি এক ধরনের নীরব ঘাতক, যা গরিবের পকেট থেকে টাকা বের
করে ধনীদের পকেটে ঢুকিয়ে দেয় এবং সমাজে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি ও কম মজুরি

আমাদের দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অর্থনীতিবিদরা অনেক সময় ‘কর্মসংস্থানহীন
প্রবৃদ্ধি’ (Jobless Growth) বলে থাকেন। এর মানে হলো, দেশে বড় বড়
প্রকল্প হচ্ছে, জিডিপি বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান বা
চাকরি তৈরি হচ্ছে না। লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে
বেকার বসে আছেন। অন্যদিকে যারা কাজ করছেন, তাদের মজুরিও খুব একটা বাড়ছে না।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, কৃষি বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যারা কাজ করেন,
তাদের আয়ের চেয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে অনেক বেশি হারে। যখন মানুষের আয়
বাড়ে না কিন্তু কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে আসে, তখন গরিব মানুষ আরও গরিব হতে
থাকে, আর যারা ব্যবসার মালিক তারা আরও ধনী হতে থাকেন।

দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচার

সমাজে বৈষম্য সৃষ্টির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং ব্যাংক
লুট। আমাদের ব্যাংকিং খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, হাজার হাজার কোটি টাকার
খেলাপি ঋণ। কিছু প্রভাবশালী ও অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতা
ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিচ্ছেন এবং তা আর ফেরত
দিচ্ছেন না। এই টাকা দিয়ে দেশে কোনো শিল্পকারখানাও হচ্ছে না। বরং এই টাকার
একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বেগম পাড়া বা সেকেন্ড
হোমের মতো জায়গাগুলোতে গড়ে উঠছে তাদের সম্পদের পাহাড়। সাধারণ মানুষের
জমানো টাকা এভাবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে চলে যাওয়ার কারণে দেশে
পুঁজির সংকট তৈরি হচ্ছে এবং বৈষম্য আকাশ ছুঁয়েছে।

কর ব্যবস্থার ত্রুটি ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ

একটি দেশে বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে বড় উপায় হলো ধনীদের কাছ থেকে বেশি আয়কর নেওয়া এবং
সেই টাকা দিয়ে গরিব মানুষের জন্য রাস্তা, হাসপাতাল বা স্কুল বানানো। কিন্তু
আমাদের কর ব্যবস্থা মূলত পরোক্ষ কর বা ভ্যাট (VAT) নির্ভর। আপনি বাজার থেকে
একটি সাবান বা এক প্যাকেট বিস্কুট কিনলে যে পরিমাণ ভ্যাট দেন, দেশের সবচেয়ে ধনী
ব্যক্তিটিও ওই একই জিনিস কিনলে সমান ভ্যাট দেন। অর্থাৎ, পরোক্ষ করের চাপ
গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপরই বেশি পড়ে। অন্যদিকে, যারা কোটি কোটি টাকা আয় করছেন,
তাদের অনেকেই সঠিকভাবে আয়কর বা সম্পদ কর দিচ্ছেন না। কর ফাঁকি দেওয়ার এই
সংস্কৃতির কারণে সরকার বাধ্য হয়ে পরোক্ষ কর বাড়াচ্ছে, যা সরাসরি
বৈষম্য বাড়াতে সাহায্য করছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে চরম বৈষম্য

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বর্তমানে এই দুটি খাত পুরোপুরি
বাণিজ্যিকীকরণের শিকার। যার টাকা আছে, সে তার সন্তানকে ব্যয়বহুল ইংরেজি
মাধ্যম স্কুলে বা বিদেশে পড়াচ্ছে এবং অসুস্থ হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য
প্রাইভেট হাসপাতাল বা দেশের বাইরে যাচ্ছে। অন্যদিকে গরিব ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত
মানুষের ভরসা হলো সরকারি স্কুল এবং হাসপাতাল, যেখানে সেবার মান অনেক
ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। মানসম্মত শিক্ষা না পাওয়ার কারণে গরিব ঘরের
সন্তানরা ভবিষ্যতে ভালো চাকরি বা পেশায় যেতে পারছে না। ফলে “গরিবের ছেলে গরিবই
থাকছে, আর ধনীর ছেলে আরও ধনী হচ্ছে”—এই দুষ্টচক্র থেকে সমাজ বের হতে পারছে না।

বৈষম্যের কারণে সমাজে কী প্রভাব পড়ছে?

অর্থনৈতিক এই বৈষম্য শুধু টাকার অঙ্কেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি আমাদের সমাজের রন্ধ্রে
রন্ধ্রে এক ভয়াবহ ক্ষতের সৃষ্টি করছে।

মধ্যবিত্তের নীরব হাহাকার

সমাজে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। গরিব মানুষ হয়তো
রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাহায্য চাইতে পারে বা সরকারি ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতে পারে।
কিন্তু মধ্যবিত্ত মানুষ লোকলজ্জার ভয়ে না পারে কাউকে বলতে, না পারে
সইতে। আয় না বাড়ায় এবং খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা তাদের জমানো সঞ্চয় ভেঙে
খাচ্ছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে ভালো বাসা ছেড়ে দিয়ে কম ভাড়ার বাসায় উঠছেন,
সন্তানদের ভালো স্কুল থেকে ছাড়িয়ে সাধারণ স্কুলে দিচ্ছেন। খাদ্যাভ্যাস থেকে
মাছ-মাংস প্রায় বাদ দিয়ে শুধু কোনোমতে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন তারা।
একটি সমাজের মেরুদণ্ড হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আর সেই শ্রেণি যখন এভাবে ভেঙে পড়ে,
তখন দেশের প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধি

যখন চোখের সামনে একদল মানুষ সীমাহীন বিলাসী জীবনযাপন করে এবং অন্যদল দু’বেলা
দু’মুঠো খাবারের জন্য হাহাকার করে, তখন সমাজে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
বেকারত্ব ও অভাবের তাড়নায় তরুণ সমাজ বিপথগামী হচ্ছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি,
প্রতারণা এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধগুলো সমাজে আশঙ্কাজনক হারে
বাড়ছে। মানুষের মধ্যে হতাশা ও মানসিক বিষণ্ণতা বাড়ছে, যার ফলে
পারিবারিক কলহ এবং আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও প্রতিনিয়ত
খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।

এই বৈষম্য দূর করার উপায় কী?

উন্নয়নের ধারায় এই বৈষম্য কমানো খুব সহজ কাজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। এর জন্য রাষ্ট্র,
সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের আন্তরিক সদিচ্ছা ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমন

বৈষম্য কমানোর প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। দুর্নীতির
বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি শুধু মুখে নয়, কাজে প্রমাণ করতে হবে।
যারা ব্যাংক থেকে টাকা লুট করছে বা বিদেশে অর্থ পাচার করছে, তারা যত
ক্ষমতাশালীই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি
নিশ্চিত করতে হবে। লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধার করে তা দেশের অর্থনীতিতে ফিরিয়ে
আনতে হবে।

সুষম কর ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা

পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের আওতা বাড়াতে হবে। যাদের
সম্পদ বেশি, তাদের ওপর সম্পদ কর (Wealth Tax) আরোপ করতে হবে এবং কর ফাঁকি
রোধে ডিজিটাল ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। সেই সাথে গরিব ও পিছিয়ে পড়া মানুষের
জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) যেমন—বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা,
টিসিবির মাধ্যমে কম দামে পণ্য বিক্রি ইত্যাদি কার্যক্রম আরও বাড়াতে হবে এবং এখানে
যেন কোনো রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মমুখী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি

মুখস্থবিদ্যা নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বদলে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে
হবে, যাতে তরুণরা পড়াশোনা শেষ করে নিজেরাই নিজেদের কাজের ব্যবস্থা করতে পারে। ছোট ও
মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে ঋণ দিতে হবে। দেশে নতুন নতুন
শিল্পকারখানা স্থাপন করে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের উন্নয়ন বলতে শুধু ইটের পর ইট গেঁথে বড় বড় ইমারত বা
ব্রিজ বানানোকে বোঝায় না। প্রকৃত উন্নয়ন হলো সেই দেশের সবচেয়ে দুর্বল বা
দরিদ্র মানুষটি কেমন আছে, তার জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হয়েছে, তা নিশ্চিত
করা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়নকে অস্বীকার
করার কোনো উপায় নেই, কিন্তু সেই উন্নয়নের ধারায় বৈষম্য যেভাবে বাড়ছে, তা আমাদের
জন্য এক ভয়ংকর অশনিসংকেত।

উন্নয়নের সুফল যদি গুটি কয়েক মানুষের পকেটে গিয়ে জমা হয় এবং সমাজের বৃহত্তর অংশ যদি
জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে ধুঁকতে থাকে, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না।
বৈষম্যের এই পাহাড় প্রমাণ দেয়াল একদিন সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। তাই
এখনই সময় শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বা
ইনক্লুসিভ গ্রোথ (Inclusive Growth)-এর দিকে মনোযোগ দেওয়ার। রাষ্ট্রকে
এমনভাবে তার নীতি সাজাতে হবে, যাতে প্রতিটি নাগরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য
ও কর্মসংস্থানের সমান সুযোগ পায়। বৈষম্য কমিয়ে এনে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ
প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই আমাদের বর্তমান উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে
সার্থক হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে
উঠবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ