দেশের অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের জীবনমান উন্নত করতে সরকার প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ করে। এই বিপুল অর্থের সঠিক ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার এবার একটি কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে প্রধান করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি–সংক্রান্ত একটি শক্তিশালী মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এই বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করে সবাইকে জানানো হয়। এই নতুন কমিটিতে মোট ১৪ জন অত্যন্ত দক্ষ সদস্য রয়েছেন। অর্থমন্ত্রী নিজে এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আমাদের দেশের মোট বাজেটের প্রায় ১৬% থেকে ১৭% সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় হয়, যার পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) ছাড়িয়ে যায়। তাই এই খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই জরুরি।
এই নতুন মন্ত্রিসভা কমিটি মূলত সারা দেশে চলমান বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করবে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই কমিটি প্রতি ৩ মাসে অন্তত একবার বৈঠকে বসবে এবং কাজের অগ্রগতি যাচাই করবে। তবে প্রতি বছর মার্চ মাসে কমিটির একটি বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেই বিশেষ সভায় দেশে চলমান ১৮টি প্রধান কর্মসূচির কার্যক্রম মাঠে কেমন চলছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করা হবে। এরপর সেই মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে আগামী অর্থবছরের জন্য এই খাতের সঠিক বাজেট নির্ধারণ করা হবে।
সরকার একটি দীর্ঘ তালিকা ধরে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। এই মন্ত্রিসভা কমিটির মূল্যায়নের তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য কর্মসূচিগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, বয়স্ক ভাতা কার্যক্রম এবং বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা কার্যক্রম। এছাড়া প্রতিবন্ধী ভাতা ও তাদের শিক্ষা উপবৃত্তির কার্যক্রম এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রমও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হবে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯% এর ওপরে থাকায় অসহায় মানুষদের জন্য এই ভাতাগুলো বেঁচে থাকার বড় ভরসা।
স্বাস্থ্য খাতেও সরকারের বেশ কিছু বড় অনুদান রয়েছে। ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদ্রোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম এই কমিটির কড়া নজরদারিতে থাকবে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা কার্যক্রম যথারীতি চলবে। তবে এবার সরকারের এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। সেটি হলো জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের মাসিক সম্মানী ভাতা কার্যক্রম। জুলাইয়ের এই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের বীরদের যথাযথ সম্মান ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নারী, শিশু ও দরিদ্রদের জন্য আরও কিছু বড় কর্মসূচি রয়েছে যা এই কমিটি নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করবে। মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি এবং ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট বা দুস্থ নারীদের সহায়তার বিষয়টি এর মধ্যে অন্যতম। পাশাপাশি অতি দরিদ্রদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং ভিজিএফ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ চলবে। কৃষকদের উৎসাহ দিতে কৃষক কার্ড কার্যক্রমও এই ১৮টি কর্মসূচির তালিকায় স্থান পেয়েছে।
আমাদের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে রপ্তানিমুখী শিল্প। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০% আসে এই খাত থেকে। এই খাতের দুস্থ শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছে সরকার। একই সাথে বিভিন্ন মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী কার্যক্রমও চলমান থাকবে। এছাড়া পরিবেশ রক্ষার জন্য সরকার প্রতি বছর প্রচুর টাকা খরচ করে। তাই পরিবেশবান্ধব খাল খনন কর্মসূচি এবং দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিগুলো সরাসরি এই নতুন মন্ত্রিসভা কমিটির মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।
এই বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মযজ্ঞ সফলভাবে পরিচালনার জন্য কমিটিতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের যুক্ত করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর পাশাপাশি এই কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী। এছাড়া সমাজকল্যাণমন্ত্রী, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী এবং কৃষিমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রী এই কমিটির সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। সবাই আশা করছেন, এই ১৪ সদস্যের কমিটি সঠিকভাবে কাজ করলে দেশের লাখ লাখ গরিব মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।
















