বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিসিবির বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা অ্যাডহক কমিটির প্রধান লক্ষ্য হলো আগামী জুন মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এই কমিটিকে দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে তিন মাসের একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। তবে দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে বর্তমান কমিটি সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন শেষ করতে চায়।
গত ৭ এপ্রিল আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন আগের বিসিবি কমিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। গত বছরের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, ভোট কারচুপি ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর এনএসসি এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। কমিটি বিলুপ্ত করার পর একই দিনে তারা ১১ সদস্যের একটি নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন করে। দেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এনএসসি নতুন কমিটিকে ৬ জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু ক্রিকেটের স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত ফিরিয়ে আনতে বোর্ড এখন তার আগেই নির্বাচন শেষ করার জোরালো পরিকল্পনা করছে।
গত সোমবার মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের প্রেস বক্সে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তামিম ইকবাল বিসিবির এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, আমরা নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন আয়োজনের জন্য পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছি। যদি বড় কোনো আইনি বা কাঠামোগত জটিলতা আমাদের সামনে এসে না দাঁড়ায়, তবে আমরা জুনের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে নির্বাচন আয়োজন করতে চাই। তবে নির্বাচন আয়োজনের আগে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি আনুষ্ঠানিকতা আমাদের শেষ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে তাদের কাজ করবে।
অ্যাডহক কমিটির দায়িত্ব নেওয়ার দিন তামিম ইকবাল স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, এই কমিটির সদস্যরা চাইলে আসন্ন বিসিবি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এটি তাদের একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, এখানে বোর্ডের কোনো চাপ নেই। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি ক্রিকেটের সার্বিক উন্নয়নে বেশ কিছু নতুন ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের দ্বিতীয় বোর্ড সভাতেই জাতীয় দলের বাইরে থাকা পুরুষ ও নারী ক্রিকেটারদের বেতন ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। একই সাথে জাতীয় নারী দলের ম্যাচ ফি-ও আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। নারী ও তৃণমূল ক্রিকেটারদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে বিসিবি এবার প্রায় ২৫,০০০ ডলার বা তার সমপরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ বাজেটে যুক্ত করেছে।
দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ঘরোয়া আসর ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল) নিয়েও নতুন সিদ্ধান্ত এসেছে। দেশের অনেক ক্রিকেটারের রুটি-রুজির প্রধান উৎস এই টুর্নামেন্ট। সাম্প্রতিক কিছু জটিলতা ও বাধা পেরিয়ে আগামী মে মাসের শুরুর দিকে ডিপিএল আবার মাঠে গড়াচ্ছে। এর আগেই ক্রিকেটারদের দলবদলের আনুষ্ঠানিকতা সফলভাবে শেষ হয়েছে। ডিপিএল আবার শুরু হলে দেশের প্রায় ২০০ জনের বেশি ক্রিকেটার আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং তারা নিজেদের ফিটনেস ও ফর্ম ধরে রাখতে পারবেন।
বর্তমানে মাঠে চলছে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার সীমিত ওভারের ক্রিকেট সিরিজ। এই সিরিজ চলাকালেও বিসিবি দর্শকদের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। দর্শকরা যেন মাঠে বসে খেলা দেখার সময় অতিরিক্ত দামে খাবার কিনতে বাধ্য না হন, সেজন্য স্টেডিয়ামের ভেতরের খাবারের দামের একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাঠে বল বয়দেরও ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড। তবে তামিম জানিয়েছেন, দেশে এখন তীব্র দাবদাহ চলছে। তাই প্রচণ্ড গরমের কথা চিন্তা করে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে বল বয় রাখা হচ্ছে না। ওয়ানডের পর শুরু হতে যাওয়া তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে বল বয়রা মাঠে থাকবে।
সব মিলিয়ে তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন নতুন অ্যাডহক কমিটি বাংলাদেশ ক্রিকেটে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া নিয়ে এসেছে। ক্রিকেট অনুরাগী থেকে শুরু করে সাধারণ খেলোয়াড়রা আশা করছেন, জুনের এই নির্বাচনের মাধ্যমে বিসিবি একটি সৎ, যোগ্য ও স্থায়ী নেতৃত্ব পাবে। সঠিক নেতৃত্ব পেলে দেশের ক্রিকেট ভবিষ্যতে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
















