চুয়েটে উপাচার্য ১২ ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ: পদত্যাগের দাবিতে অনড় শিক্ষার্থীরা, শিক্ষকদের সর্বাত্মক অসহযোগ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিজ কার্যালয়ে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। ফলে উপাচার্যসহ তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। সন্ধ্যায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্যের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন। মধ্যরাত পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে হঠাৎ অপসারণ করায় ফুঁসে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যাম্পাসে সর্বাত্মক শাটডাউন পালন করছেন। শিক্ষার্থীদের এই দাবির প্রতি পূর্ণ একাত্মতা জানিয়ে কর্মবিরতি শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও। ফলে টানা তিন সপ্তাহ ধরে চুয়েটের ১০০% ক্লাস ও পরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

সোমবার সকাল থেকে ক্যাম্পাসে নতুন করে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানান, সকাল ৯টার দিকে নতুন উপাচার্য চুয়েট ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এই খবর দ্রুত ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁরা উপাচার্যকে দুপুর ১২টার মধ্যে সম্মানজনকভাবে ভবন ছেড়ে চলে যাওয়ার আলটিমেটাম দেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তিনি বের না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভবনের প্রধান ফটকে আবার তালা লাগিয়ে দেন।

ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ায় উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমের সঙ্গে চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, তাঁর অনুসারী এবং কয়েকজন সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীও ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। উপাচার্যের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হন শিক্ষক-কর্মচারীরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক এই অচলাবস্থার কারণে প্রশাসনিক ও আর্থিক সব কর্মকাণ্ড থমকে গেছে। শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রকল্পের হাজার হাজার ডলার ($) ছাড় হওয়ার কথা, সেখানে উপাচার্যের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম এখন পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্দোলন আরও জোরদার করতে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি এবং স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন এক যৌথ জরুরি সভায় বসে। সভা শেষে বেলা সোয়া ৩টায় সংবাদ সম্মেলন করে তারা ‘সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি’র ডাক দেয়। সংগঠনের নেতারা সাফ জানিয়ে দেন, পূর্বঘোষিত দাবি না মানা পর্যন্ত কর্মবিরতির পাশাপাশি অসহযোগ চলবে। নতুন উপাচার্যকে কোনোভাবেই প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করা হবে না।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাউজান উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংছিং মারমা চুয়েট ক্যাম্পাসে যান এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন। এ সময় তিনি অবরুদ্ধ উপাচার্যসহ ভেতরে আটকে পড়া অন্যদের জন্য বিদ্যুৎ, পানি ও খাবারের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। শিক্ষার্থীরা জানান, মানবিক দিক বিবেচনা করে তাঁরা খাবার ও পানি দিয়েছেন, কিন্তু বিদ্যুৎ-সংযোগ কোনোভাবেই দেবেন না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ভবনে বিদ্যুৎ বন্ধই থাকবে।

যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, আমাদের আন্দোলন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছিল না। কিন্তু তিনি ক্যাম্পাসে আসার আগেই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন আটকে দিয়েছেন। আজ তালা ভেঙে অফিসে ঢুকেছেন এবং চুয়েটের বাসে হামলা করিয়েছেন। এখন আর কোনো আপস হবে না, আমরা তাঁর সরাসরি পদত্যাগ চাই। তিনি পদত্যাগপত্র দিলেই সসম্মানে বিদ্যুৎসহ সব সুবিধা পাবেন এবং বের হতে পারবেন। পদত্যাগ ছাড়া এই অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না।

এদিকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসে চরম থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। প্রশাসনিক ভবনের চারপাশ ঘিরে শিক্ষার্থীরা স্লোগানে মুখর করে রাখেন পুরো চুয়েট এলাকা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, দ্রুত শিক্ষা মন্ত্রণালয় কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে দীর্ঘমেয়াদি সেশনজটের কবলে পড়বে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। তবে নতুন উপাচার্যের বিদায় এবং সাবেক ভিসিকে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত এক চুলও পিছু হটবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ