সৌদি আরবের দুটি ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নারীসহ অন্তত তিনজন বিদেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে এই ভয়াবহ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ৩৬ জন। সৌদি সরকার সরাসরি ইয়েমেনের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের এই পরিকল্পিত হামলার জন্য দায়ী করেছে। স্থানীয় সময় বুধবার ও বৃহস্পতিবার হুতিরা পৃথকভাবে এই হামলা দুটি চালায়। আক্রান্ত বিমানবন্দর দুটির একটি রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং অন্যটি দক্ষিণাঞ্চলীয় আসির প্রদেশের আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। হঠাৎ এই হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ বেসামরিক যাত্রীদের লক্ষ্য করে চালানো এই অমানবিক ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (জিএসিএ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হামলাকারীরা প্রথম আঘাতটি হানে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে ড্রোন বিস্ফোরণে দুজন বিদেশি নারী ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে একজন মরক্কো এবং অন্যজন আলজেরিয়ার নাগরিক। এ ছাড়া এই হামলায় বিমানবন্দরে থাকা বিভিন্ন দেশের আরও ২৮ জন যাত্রী ও কর্মী আহত হন। উদ্ধারকর্মীরা আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। আকস্মিক এই বিস্ফোরণে আভা বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবনের বেশ ক্ষতি হয় এবং যাত্রীদের মধ্যে তীব্র হুড়োহুড়ি লেগে যায়।
অন্যদিকে সৌদি আরবের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দ্বিতীয় হামলার ঘটনাটি ঘটে। সেখানে হুতিদের ছোঁড়া অস্ত্রের আঘাতে একজন সুদানি প্রবাসী নাগরিক নিহত হন। একই হামলায় আরও আটজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজনই সৌদির নিজস্ব নাগরিক। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর মূল বিমানবন্দরে এমন রক্তক্ষয়ী হামলায় সবাই হতবাক হয়ে পড়ে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনের শারীরিক অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার পরপরই নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। তবে নিহত ও চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয় এখনো প্রকাশ করেনি প্রশাসন।
বেসামরিক বিমানবন্দরে এই অপ্রত্যাশিত হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বিমান চলাচলে বড় বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বিমানবন্দর দুটিতে সাময়িকভাবে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ করে দেয়। এতে ওই অঞ্চলের প্রায় ২০% আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল কিংবা দীর্ঘ সময় পিছিয়ে যায়। অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং ফ্লাইট বাতিলে এভিয়েশন খাতে প্রাথমিক হিসাবে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ($) আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আকাশপথে এমন ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো তাদের নিয়মিত রুটের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) এই হামলার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জোটের নেতারা স্পষ্ট বলেন, সাধারণ বেসামরিক মানুষদের নিশানা বানিয়ে এই ধরণের কাপুরুষোচিত আক্রমণ কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস নিজ দেশের নাগরিকদের চলাচলে সতর্কতা জারি করেছে। যেকোনো বিপদ এড়াতে মার্কিন নাগরিকদের শতভাগ (১০০%) সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাত্র ১৯ ঘণ্টা আগে ইয়েমেনের এডেন বিমানবন্দর লক্ষ্য করেও হুতিরা একই ধরনের মিসাইল হামলা চালিয়েছিল, যা পুরো অঞ্চলের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইয়েমেনের চলমান গৃহযুদ্ধে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে। সেই সংঘাতের জেরে হুতিরা এখন সরাসরি সৌদির অভ্যন্তরে দূরপাল্লার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। সাধারণ যাত্রীদের বিমানবন্দরে লক্ষ্যবস্তু বানানোয় আন্তর্জাতিক মহলেও চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এই ঘটনার পর সৌদি প্রতিরক্ষা বিভাগ সীমান্তে আকাশপথে নজরদারি বাড়িয়েছে। যেকোনো নতুন আক্রমণ প্রতিহত করতে তাদের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বেসামরিক স্থাপনায় এমন আগ্রাসন বন্ধ না হলে সৌদি জোট আরও কঠোর সামরিক জবাব দিতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
সৌদি আরবে বর্তমানে ২৫ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করেন। রাজধানী রিয়াদ এবং আভা শহরেও প্রচুর বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। প্রতিদিন বহু প্রবাসী জীবিকার তাগিদে এই দুই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। ফলে এমন ভয়াবহ হামলার খবরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝেও চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সৌদিতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস প্রবাসীদের সতর্কভাবে চলাফেরা করতে এবং বিমানবন্দর এলাকায় বাড়তি নজরদারি বজায় রাখতে বলেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কথা জানালেও সাধারণ মানুষের ভীতি কাটেনি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুতিদের এই বেপরোয়া হামলা অবিলম্বে না থামলে উপসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি ও অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়বে।















