ভারতে পণ্য রপ্তানিতে বাধা দূর ও পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি বাংলাদেশের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে স্থলবন্দরভিত্তিক নানা বিধিনিষেধ ও অশুল্ক বাধা দূর করার জোরালো দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি পাটপণ্য ও পেট ফিল্মের ওপর ভারত যে অন্যায্য অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক চাপিয়ে রেখেছে, তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ৮ ও ৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৬তম বৈঠকে এই বিষয়গুলো সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। দুই দিনব্যাপী চলা এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশীয় শিল্প ও রপ্তানিকারকদের স্বার্থ রক্ষায় একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুই দেশের এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে অংশগ্রহণ করে। বৈঠকে প্রতিনিধিরা স্পষ্ট করে বলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ১২ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের ()বিশালবাণিজ্যহলেওবাংলাদেশেররপ্তানিএখনওমাত্র২বিলিয়নডলারের()বিশালবাণিজ্যহলেওবাংলাদেশেররপ্তানিএখনওমাত্র২বিলিয়নডলারের() ঘরে আটকে আছে। বিপুল এই বৈষম্যমূলক বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে হলে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ করতে হবে এবং সীমান্ত এলাকার সব কৃত্রিম জটিলতা অনতিবিলম্বে নিরসন করা প্রয়োজন।

স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণের পরও যাতে ভারতের বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা বহাল থাকে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দেয় ঢাকা। দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা সাফটার আওতায় এই বাণিজ্যিক সুবিধা কীভাবে অব্যাহত রাখা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস বা বিআইএস (BIS) সনদের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে বৈঠকে অসন্তোষ জানায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশি পণ্যের মান সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি না থাকায় রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাই ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সহজ করার জোর তাগিদ দেওয়া হয়।

আঞ্চলিক যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও ছিল এই বৈঠকের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ভারতীয় ভূখণ্ডকে করিডোর বা ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি নেপাল ও ভুটানে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। এছাড়া ভারতের স্থল কাস্টমস স্টেশনগুলোর অবকাঠামোগত সংকটের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরে ঢাকা। ভারতীয় অংশে আধুনিক পার্কিং ইয়ার্ড, গুদাম ও কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থার তীব্র ঘাটতি রয়েছে। এই অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সীমান্তে পণ্য খালাসে প্রায় ৫০% থেকে ৬০% অতিরিক্ত সময় অপচয় হচ্ছে, যা রপ্তানি ব্যয় বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে ভারতের পক্ষ থেকেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের কিছু নির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতা দূর করার পাল্টা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের তুলার সুতা ও অন্যান্য শিল্প কাঁচামাল প্রবেশের ক্ষেত্রে যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তা প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছে নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি সহজ করা, আখাউড়া-আগরতলা রুটের পণ্য পরিবহন বাড়ানো, সমন্বিত রেল যোগাযোগ এবং যৌথ সীমান্ত হাটের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করে ভারতীয় প্রতিনিধিদল।

ব্যবসায়ীদের সরাসরি অংশীদারত্ব বাড়াতে দুই দেশের শীর্ষ বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ‘সিইওস ফোরাম’ অবিলম্বে কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়। উভয় দেশের প্রতিনিধিরা একমত হন যে, নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা নিয়মিত সংলাপে বসলে বাণিজ্যিক ভুল বোঝাবুঝির প্রায় ১০০% সমাধান নিজেদের মধ্যেই সম্ভব। এতে সীমান্ত এলাকায় অনানুষ্ঠানিক বা চোরাই বাণিজ্য বন্ধ হবে এবং তৈরি পোশাক ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো সম্ভাবনাময় শিল্পে দুই দেশের যৌথ বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক মেলবন্ধন বাড়ানোর এক বিশাল সুযোগ রয়েছে। তবে এর সুফল পেতে হলে কেবল বৈঠক নয়, বরং অশুল্ক বাধার প্রাচীর ভাঙতে হবে। স্থলবন্দরের দীর্ঘসূত্রতা এবং অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের মতো বৈষম্যমূলক নীতি দূর হলে বাংলাদেশের পাট ও রপ্তানি খাত নতুন প্রাণ পাবে। সীমান্ত বাণিজ্যের অবকাঠামো আধুনিকায়নের মাধ্যমেই দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশ পারস্পরিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে। নয়াদিল্লির এই ১৬তম বৈঠকের ইতিবাচক সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সংকট নিরসনে একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ