শৈলকুপায় ১৩ একর জমি ছাড়তে ১৫ দিনের সময় দিল প্রশাসন: অন্যথায় উচ্ছেদের কড়া হুঁশিয়ারি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ ১৩ একর ফসলি জমির অবৈধ দখল ছাড়তে দখলদার পক্ষকে ১৫ দিনের চূড়ান্ত সময় বেঁধে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহফুজুর রহমান এই কঠোর আদেশ জারি করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদনকারীর অনুকূলে দখল বুঝিয়ে না দিলে বলপ্রয়োগ করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং মালামাল ক্রোকের কড়া নির্দেশ দেন আদালত। আদালতের এই স্পষ্ট আদেশে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই শেষে স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন জমির প্রকৃত মালিক। একই সঙ্গে নতুন ভূমি আইনের কঠোর প্রয়োগে শৈলকুপার অবৈধ দখলদারদের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া মৌজার অত্যন্ত মূল্যবান এই ১৩ একর জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বহু বছর ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে ভুক্তভোগী পক্ষ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আদালতে ০৪/২০২৬ নম্বর মামলা দায়ের করেন। শুনানিতে ম্যাজিস্ট্রেট উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন, দাখিল করা দলিলপত্র যাচাই করেন এবং ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেন। সব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার পর পরিষ্কার হয়ে যায় যে, জমিতে বিবাদী পক্ষের কোনো বৈধ স্বত্ব নেই। তারা ০% আইনি অধিকার নিয়েই গায়ের জোরে জমিটি দখল করে রেখেছিল।

আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ৮ ধারা অনুযায়ী বিবাদীদের আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জমির দখল ছাড়তে হবে। একই সঙ্গে জমিতে তাদের কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বা ফসল থাকলে তা নিজ খরচে সরিয়ে নিয়ে আবেদনকারীকে জমি বুঝিয়ে দিতে হবে। এই আইনে অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদেশ কার্যকর না করলে প্রশাসন পুলিশ মোতায়েন করে সরাসরি উচ্ছেদ অভিযান চালাবে এবং বিবাদীদের যাবতীয় সম্পত্তি ক্রোক করবে।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, বাগুটিয়া মৌজার এই ১৩ একর তিনফসলি জমির বর্তমান বাজারদর কয়েক কোটি টাকা, যা আন্তর্জাতিক মূল্যে প্রায় ৫ লাখ ডলারের ($৫,০০,০০০) চেয়েও বেশি। প্রতি বছর এই জমিতে শত শত মণ ধান, পাট ও রবিশস্য উৎপাদন হয়। কিন্তু অবৈধ দখলের কারণে দীর্ঘ দিন ধরে প্রকৃত জমির মালিকরা তাদের ন্যায্য ফসল থেকে বঞ্চিত ছিলেন। প্রভাবশালীদের পেশিশক্তির কারণে অসহায় মালিকরা এত দিন জমিতে নামতেই সাহস পাননি। ফলে পরিবারের জীবিকা নিয়ে চরম আর্থিক টানাপোড়েনে দিন কাটাচ্ছিলেন তারা।

ইতোমধ্যেই আদেশের অনুলিপি শৈলকুপা থানা পুলিশ, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। নির্দিষ্ট ১৫ দিনের মেয়াদ পার হওয়ামাত্র জমিতে লাল নিশানা টাঙিয়ে আবেদনকারীকে দখল বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। শৈলকুপা থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, উচ্ছেদ অভিযানে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এলাকায় সংঘাত এড়াতে এবং পরিস্থিতি ১০০% নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছেন।

আইনজীবীরা জানান, ২০২৩ সালের নতুন ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন সাধারণ মানুষের জমি উদ্ধারে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আগে জমি উদ্ধারের দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত লেগে যেত। এখন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রিয়ায় সরাসরি উচ্ছেদের রায় দিতে পারছেন। এর ফলে দীর্ঘদিনের ভূমি সংক্রান্ত মামলা জট ৫০% থেকে ৬০% কমে আসছে। শৈলকুপার এই আদেশটি কার্যকর হলে পুরো উপজেলার ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে একটি জোরালো সতর্কবার্তা যাবে।

প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বাগুটিয়া মৌজার সাধারণ বাসিন্দারা। তারা আশা করছেন, কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে প্রশাসন দ্রুত এই উচ্ছেদ সম্পন্ন করবে। ভুক্তভোগী পরিবারটি জানিয়েছে, প্রশাসনের দৃঢ় ভূমিকায় তারা পৈতৃক জমি ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। শৈলকুপা উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি তারা নিয়মিত তদারকি করছে। জমির দখল হস্তান্তরের বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে দ্রুত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে প্রশাসন সবসময় মাঠে থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ