পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেছিল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। তবে কর্মসূচি শুরুর ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও বিক্ষোভের গাড়িবহর মূলত দলটির নিজস্ব ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশেই ঘুরপাক খাচ্ছে। হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক দলীয় পতাকা নিয়ে বাসের ছাদে চড়ে স্লোগান দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও নানা বাধার মুখে পড়েছে। গত ৪ অক্টোবর রোববার এই প্রদেশ থেকে যাত্রা শুরুর পর বৃহস্পতিবারই রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা ছিল তাদের। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর অবস্থান, পুলিশি ব্যারিকেড ও দলটির অভ্যন্তরীণ কৌশলের কারণে লংমার্চের গতি প্রায় থমকে গেছে।
বর্তমানে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি নিজেই এই লংমার্চের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারে এক বিশাল সমাবেশ শেষ করে তিনি লংমার্চ নিয়ে চারসদ্দার দিকে রওনা হন। দলীয় নেতা-কর্মীদের মনোবল বাড়াতে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা দেন, চারসদ্দার হয়ে বিক্ষোভকারীরা সাবি জেলার দিকে যাবে এবং এরপর পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করা হবে। পিটিআই তাদের এক্স হ্যান্ডলে বিশাল কর্মী-সমর্থকদের ভিডিও প্রকাশ করে রাজপথে থাকার প্রত্যয় জানিয়েছে। তবে লংমার্চের রুট দফায় দফায় বদল করায় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার পিটিআইয়ের এই কর্মসূচি ঠেকাতে সব ধরনের কঠোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি দলটির নেতা-কর্মীদের সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, পিটিআই নেতা-কর্মীদের পাঞ্জাব সীমান্তের সাবি এলাকা পার হওয়ার কোনো সাহস নেই। সাবির দিকে এগোলেই নাকি তাদের বুক কাঁপে। একই সুরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো মূল্যে বিক্ষোভকারীদের ইসলামাবাদে ঢোকা ঠেকাবে পুলিশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী জানান, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে আলোচনা প্রায় ১০০% সম্পন্ন হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
কেন্দ্রের এমন কড়া হুমকির মুখেও অনড় অবস্থানে রয়েছে পিটিআই। দলটির প্রাদেশিক মুখপাত্র শওকত ইউসুফজাই প্রদেশে গভর্নরের ‘অঘোষিত শাসন’ চালানোর অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, নেতা-কর্মীদের অবশ্যই দলের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিতে হবে। ইমরান খানের নিঃশর্ত মুক্তি ছাড়া এই লংমার্চ কোনো অবস্থাতেই থামবে না। তিনি সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের গোপন আপস বা মধ্যস্থতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, নেতা-কর্মীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ না হলে আন্দোলন আরও তীব্র রূপ নেবে।
তোশাখানা ও অন্যান্য মামলায় ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারাবন্দী রয়েছেন পিটিআই প্রধান ইমরান খান। দলটির দাবি, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে জেলে আটকে রেখেছে। সেই ক্ষোভ থেকেই গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকারি দলের সঙ্গে দুই দফা বৈঠকের কারণে কর্মসূচি পিছিয়ে ৪ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পরও সরকার ইমরানকে মুক্তি দিতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাজপথের এই চূড়ান্ত লড়াই বেছে নেয় পিটিআই।
পাকিস্তানের সাবেক সিনেটর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফ্রাসিয়াব খটক মনে করেন, কেন্দ্রীয় সরকারের আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে লংমার্চের বহর সহজে পাঞ্জাব কিংবা ইসলামাবাদে ঢুকতে পারবে না। তিনি জানান, নিরাপত্তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা রয়েছে এবং শুধু পিটিআই কর্মী নয়, স্বয়ং প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রীরাও এখন অপহরণ ও গুমের শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান এই রাজনৈতিক সংঘাতে পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি প্রতিদিন কোটি কোটি ডলারের ($) ক্ষতির মুখে পড়ছে। দেশে মূল্যস্ফীতি প্রায় ২৫% ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তার ওপর এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন চরম বিস্ফোরণোন্মুখ রূপ নিয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার সীমা পেরিয়ে লংমার্চের গাড়িবহর পাঞ্জাবে ঢুকতে গেলে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পিটিআই দাবি আদায়ে শেষ পর্যন্ত রাস্তায় টিকে থাকতে পারবে নাকি কেন্দ্র সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে আন্দোলন দমন করবে, তা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।















