নাটোর রেলওয়ে স্টেশনের প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার থেকে ক্রিল ল্যান্ডার নামের এক জার্মান পর্যটকের ল্যাপটপ, ক্যামেরা ও জরুরি মালামালভর্তি ট্রাভেল ব্যাগ চুরি হয়ে গেছে। বুধবার বিকেল ঠিক ৫টার দিকে স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন বিশ্রামকক্ষে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর পরই ভুক্তভোগী ওই বিদেশি পর্যটক নাটোর সদর থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত শুরু করেছে। তারা রেলওয়ে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে।
ভুক্তভোগী ক্রিল ল্যান্ডার জানান, বাংলাদেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে এসে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখছিলেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বুধবার সকাল থেকেই তিনি বগুড়ার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা ঘুরে দেখেন। পরে বগুড়া থেকে সান্তাহার জংশন স্টেশনে এসে দর্শনাগামী একটি ট্রেনে ওঠেন। তাঁর মূল গন্তব্য ছিল দর্শনা রেলস্টেশন। কিন্তু ট্রেনের যাত্রাপথ ও পরবর্তী স্টেশনের নাম ঠিকমতো বুঝতে না পারায় তিনি বিভ্রান্তিতে পড়েন। ফলে ভুলবশত দর্শনার পরিবর্তে নাটোর স্টেশনেই নেমে যান।
ভুল স্টেশনে নেমে পড়ার পর পরবর্তী ট্রেনের টিকিট কেটে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন ক্রিল ল্যান্ডার। তিনি নাটোর রেলস্টেশনের প্রথম শ্রেণির যাত্রী বিশ্রামাগারে গিয়ে নিজের ব্যাগ নিয়ে বসেন। সেখানে অপেক্ষারত এক অচেনা যুবকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ওই যুবক ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তাঁর সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলে দ্রুত সখ্য গড়ে তোলে। একপর্যায়ে জার্মান পর্যটককে অন্যমনস্ক দেখে কৌশলে তাঁর ট্রাভেল ব্যাগটি কাঁধে তুলে নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে ওই যুবক। কিছুক্ষণ পর নিজের ব্যাগ দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন ওই পর্যটক, কিন্তু ততক্ষণে চোর উধাও হয়ে যায়।
চুরি যাওয়া ব্যাগে ক্রিল ল্যান্ডারের অত্যন্ত দামি পেশাগত ও ব্যক্তিগত সরঞ্জাম ছিল। এর মধ্যে ছিল একটি উচ্চপ্রযুক্তির ল্যাপটপ, পেশাদার ফটোগ্রাফির কাজে ব্যবহৃত ডিএসএলআর ক্যামেরা, বেশ কয়েকটি দামি লেন্স ও প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক গ্যাজেট। এ ছাড়া ব্যাগের ভেতরে তাঁর জরুরি ভ্রমণ নথিপত্র এবং নগদ প্রায় ১,৫০০ মার্কিন ডলার ($) ছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় খোয়া যাওয়া মালামালের মোট আর্থিক মূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকার কাছাকাছি। বিশেষ করে ক্যামেরার মেমোরি কার্ড ও ল্যাপটপে তাঁর পুরো বাংলাদেশ ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও ভিডিও সংরক্ষিত ছিল, যা হারিয়ে তিনি চরম বিপাকে পড়েছেন।
ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ক্রিল ল্যান্ডার তাৎক্ষণিকভাবে নাটোর রেলস্টেশনের কর্তব্যরত স্টেশন মাস্টারের কাছে ছুটে যান। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের পরামর্শে তিনি দ্রুত নাটোর সদর থানায় গিয়ে হাজির হন। নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সন্ধ্যার দিকে ওই বিদেশি পর্যটক থানায় এসে মৌখিকভাবে বিস্তারিত জানান। এরপর তাঁর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত একটি জিডি নথিভুক্ত করা হয়। ওসি জানান, রেলস্টেশনের ভেতরের এলাকা রেলওয়ে পুলিশের আওতাধীন হওয়ায় তাঁরা সান্তাহার রেলওয়ে থানা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে দ্রুত যোগাযোগ করে দেন।
ওসি মনসুর রহমান জানান, চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধার করতে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের বিশেষ দল কাজ শুরু করেছে। পুলিশ ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিভাইসের লোকেশন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে চোরের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ওসি বলেন, বিদেশি পর্যটকের মালামাল উদ্ধারে পুলিশ শতভাগ (১০০%) আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। ডিভাইসগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করা গেলেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে চোরকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি রেলস্টেশন ও সংলগ্ন এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে সন্দেহভাজন ওই যুবককে চিহ্নিত করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
থানায় জিডি করার আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে বুধবার রাত ৮টার দিকে ক্রিল ল্যান্ডার নাটোর থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। নাটোরে থাকার সুযোগ না থাকায় তিনি রাজশাহীতে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রিয় জিনিসপত্র হারিয়ে মন খারাপ হলেও বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক সহমর্মিতা ও পুলিশের তৎপর ভূমিকায় আশার আলো দেখছেন এই পর্যটক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পুলিশ দ্রুত তাঁর চুরি হওয়া ল্যাপটপ ও ক্যামেরা উদ্ধার করে দেশে ফেরার আগে তাঁর মুখে স্বস্তির হাসি ফিরিয়ে দেবে।















