যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা সমুন্নত রাখার অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর শান্তিতে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনবিদ নাভি পিল্লাই। শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ৮৫ বছর বয়সী এই মানবাধিকারকর্মীর নাম ঘোষণা করে। বিশ্বজুড়ে পরাশক্তিদের রাজনৈতিক আধিপত্যের মুখে যখন ন্যায়বিচার কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর প্রতীক হয়ে ওঠা এই প্রবীণ বিচারককে সর্বোচ্চ শান্তিবাদী পুরস্কারে ভূষিত করা হলো। পুরস্কারটি পাওয়ার পর তিনি তা আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার সব ভুক্তভোগীর উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন।
অসলোর সংবাদ সম্মেলনে নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে নাভি পিল্লাইয়ের সাহসির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো জঘন্য অপরাধগুলোকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পিল্লাই আজীবন আপসহীন ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত ক্ষমতার রাজনীতির তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ছে। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের শাসনকে দুর্বল করার এক বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এমন চরম সংকটকালে পিল্লাইয়ের ব্যক্তিগত সততা, বিচারিক প্রজ্ঞা ও অবিচল দৃঢ়তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে নোবেল কমিটি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন বর্ণাঢ্য অর্জনে ভরা। তিনি ১৯৯৪ সালে সংঘটিত রুয়ান্ডার রক্তক্ষয়ী গণহত্যার বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) প্রধান হিসেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। বর্তমানে তিনি রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সম্প্রতি গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত সামরিক অভিযান ও যুদ্ধাপরাধ তদন্তে গঠিত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে কাজ করে তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন।
পুরস্কার ঘোষণার সময় নাভি পিল্লাই ব্যক্তিগত সফরে জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন। প্রথমে নোবেল জয়ের বার্তা পেয়ে তিনি বিষয়টিকে অবিশ্বাস্য মনে করেছিলেন এবং ভাবছিলেন কেউ বুঝি তাঁর সঙ্গে নিছক কৌতুক করছে। খবরটি শুনে সভাকক্ষে উপস্থিত সবাই হাততালি দিতে শুরু করলে তিনি রসিকতা করে বলেন, একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে কোনো প্রামাণ্য নথি ছাড়া এটি আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, আগে বিষয়টি ভালো করে যাচাই করে নিই। এরপর তিনি আরও কৌতুক করে বলেন, আপনারা যদি আরেকটু বেশি জোরে হাততালি দেন, তবে হয়তো আমি এই পুরস্কারটি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।
তবে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে নাভি পিল্লাই বিশ্বনেতাদের ক্ষমতার মোহ ও যুদ্ধ উন্মাদনা নিয়ে কঠোর বার্তা দেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হয়ে পড়লে দুনিয়া সেই অন্ধকার যুগে ফিরে যাবে, যেখানে আইনের বদলে বন্দুক ও ক্ষমতার জোরেই মানুষের দুঃখ-কষ্টের মূল্য নির্ধারিত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, শক্তিশালী দেশগুলো বছরে শত শত কোটি ডলার ($) সামরিক খাতে ব্যয় করে নিরস্ত্র মানুষের জীবন বিপন্ন করছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা রক্ষা করা। তিনি বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় আজীবন অবিচল থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এদিকে নাভি পিল্লাই নোবেল পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো আনন্দ প্রকাশ করলেও বরাবরের মতোই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহতদের প্রায় ৭০% নারী ও শিশু হওয়া সত্ত্বেও তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করায় তেল আবিব পিল্লাইকে মেনে নিতে পারেনি। ইসরায়েল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই নোবেল ঘোষণার কড়া সমালোচনা করেছে। তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি হুমকি ও পরাশক্তিদের অপপ্রচার উপেক্ষা করে সত্য প্রকাশ করায় এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের ১০০% যোগ্য দাবিদার এই সাহসী দক্ষিণ আফ্রিকান বিচারক।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালতের শীর্ষ মঞ্চ পর্যন্ত নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ পথচলা মূলত নিপীড়িত মানুষের পক্ষে এক আপসহীন লড়াই। ক্ষমতার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি সারা জীবন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দেখতে চেয়েছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামকে শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিই দিল না, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনসহ বিশ্বজুড়ে যারা অন্যায়ের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের অধিকারের পক্ষেও এক বলিষ্ঠ বার্তা পৌঁছে দিল।















