ঝিনাইদহে রাসায়নিক সার ডিলার নিয়োগের সদ্য প্রকাশিত তালিকাকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার দুপুরে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশ করার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় বইছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি সার-বীজ মনিটরিং কমিটি সব ধরনের বিদ্যমান নীতিমালা ও যোগ্যতার শর্ত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের ভাই, শ্যালক এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করতেই এই তালিকা সাজানো হয়েছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা করে আসা শতকরা ৯০ ভাগ (৯০%) সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী বঞ্চিত হয়েছেন।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম হয়েছে হরিণাকুণ্ডু উপজেলায়। সেখানে চাঁদপুর ইউনিয়নে ডিলার করা হয়েছে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদের ভাই আব্দুল লতিফকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য, অথচ ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাকে। এছাড়া দৌলতপুর ইউনিয়নে এমপিওভুক্ত এক কলেজ শিক্ষকের স্ত্রী আনোয়ারা নাসরিনকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা সুস্পষ্ট বিধি লঙ্ঘন। এমনকি ওই নারীর মেয়ে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অন্যদিকে জোড়াদহ ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির (ওএমএস) বর্তমান ডিলার লাল্টু মিয়াকেও নতুন করে সারের ডিলার বানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সদর ও কালীগঞ্জ উপজেলায়ও একইভাবে দলীয় প্রভাব খাটানোর প্রমাণ মিলেছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাগান্না ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সহসভাপতি আলাউদ্দিন আল মামুনের শ্যালক হাফিজুর রহমান লিটনের নাম এসেছে তালিকায়, যাঁর জীবনে সার ব্যবসার বিন্দুমাত্র কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। পাগলাকানাই ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী রাকিব হাসান বন্ধন। এছাড়া কালীগঞ্জের ত্রিলোচনপুর ও শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নেও জেলা বিএনপি সভাপতির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বসানো হয়েছে। হলিধানী ইউনিয়নের মনোনীত ডিলারের নিজস্ব কোনো গুদাম কিংবা আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া ব্যাংক সচ্ছলতার সনদের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মহেশপুর উপজেলায় ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বিএনপির তৃণমূলের ভেতরেই। সেখানে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনার শ্যালক ও উপজেলা যুবলীগ সভাপতির ভাই এহসান রেজাকে ডিলার করা হয়েছে। সাবেক এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ির কেয়ারটেকার হাবিবুর রহমান বুল্লাও পেয়েছেন ডিলারশিপ। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দবির হোসেন উদ্দীন বিশ্বাস বলেন, জেলা পর্যায় থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আমরা এখন নৌকার তলে চাপা পড়েছি। তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ায় তিনি তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, সার দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অত্যন্ত সংবেদনশীল উপাদান। প্রতি বছর শত শত কোটি ডলার ($) খরচ করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার আমদানি করে রাষ্ট্র। এরপর সরকার কৃষকদের স্বার্থে এতে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দেয়। সেখানে ডিলার নিয়োগে যদি ১০০% স্বচ্ছতা না থাকে এবং গুদামবিহীন অদক্ষ ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়, তবে মাঠে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে। হরিণাকুণ্ডু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ তিতুমীরের বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলেও এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা দাবি করেন, তাঁর শ্যালক সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, ফলে তাঁকে আওয়ামী পরিবারের সদস্য বলা ভিত্তিহীন। তিনি সমগ্র জেলার তালিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না বলেও উল্লেখ করেন। অন্যদিকে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ্ত রায় দীপন বলেন, কোনো ডিলারের তদন্ত প্রতিবেদন এখনও তাঁর দপ্তরে পৌঁছায়নি। তিনি কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। তবে রহস্যজনকভাবে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নোমান হোসেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
সার ডিলার নিয়োগের এমন চরম অনিয়মে প্রান্তিক কৃষকদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। সামনেই বোরো আবাদের মৌসুম, যেখানে কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জীবন-মরণ প্রশ্ন। দুর্নীতির মাধ্যমে তৈরি এই প্রশ্নবিদ্ধ তালিকা অনতিবিলম্বে বাতিল করার জোর দাবি তুলেছেন স্থানীয় কৃষক ও সচেতন নাগরিকরা। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, অবিলম্বে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্যদের নিয়োগ না দিলে মাঠপর্যায়ে সারের তীব্র সংকট সৃষ্টি হবে এবং খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।















