ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং বাজার সিন্ডিকেটের নোংরা রাজনীতি এ দেশের সাধারণ মানুষ আর কোনোভাবেই মেনে নেবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন। তিনি বলেন, অতীতের মতো জনগণের মৌলিক অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দিন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। অন্যায়, জুলুম ও অবিচারের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ যদি একবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে দাঁড়ায়, তবে কোনো স্বৈরাচারী বা দুর্নীতিবাজ অপশক্তিই তাদের রুখে দিতে পারবে না।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকাল ১০টায় ঝিনাইদহ শহরের আলহেরা স্কুল মাঠ প্রাঙ্গণে জেলা জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত রোকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা আমির ও ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মোহাম্মদ আবুবকরের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল টিমের সদস্য আবদুল মতিন। এ সময় ঝিনাইদহ-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর মতিয়ার রহমান, ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিব, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল আলীম ও জেলা সেক্রেটারি আবদুল আওয়াল উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে জেলার ৬টি উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক রোকন অংশ নেন। তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার শপথ নেন উপস্থিত নেতাকর্মীরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোবারক হোসাইন দেশের চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একদল লোক ভেবেছে তারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর চাঁদাবাজি করবে, মানুষের জমি ও সম্পদ দখল করবে, আর বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ভোক্তাদের পকেট কাটবে। অসাধু সিন্ডিকেট বাজারে নিত্যপণ্যের দাম প্রায় ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়ে কোটি কোটি ডলার ($) বিদেশে পাচার করেছে। রাস্তাঘাট ও হাটবাজারে চাঁদাবাজির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর চরম চাপ তৈরি করছে। মানুষের রক্ত পানি করা উপার্জনে ভাগ বসিয়ে যারা রাতারাতি কোটিপতি হয়েছে, তাদের দিন ফুরিয়ে এসেছে। এ দেশের খেটে খাওয়া জনতা কোনো লুটেরা সিন্ডিকেটকে আর ছাড় দেবে না।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, ওই বিপ্লব থেকে সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধকে সবার ওপরে স্থান দিতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর যদি কেউ আবারও পুরোনো কায়দায় ক্ষমতার অপব্যবহার, দখলদারি ও দমন-পীড়নের পথে হাঁটার দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের গণপ্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জামায়াতে ইসলামী দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও শান্তি চায়, তবে মানুষের নাগরিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত হলে রাজপথে তীব্র প্রতিবাদ জারি থাকবে।
সম্মেলন থেকে অবিলম্বে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোরালো দাবি জানানো হয়। মোবারক হোসাইন বলেন, জুলাই বিপ্লবে শত শত ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদা বিবেচনা করা চলবে না। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে শতভাগ বা ১০০% নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো খুনির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কারণে আপস করার সুযোগ নেই।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ছিনতাই ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ বেড়েই চলেছে। এতে সাধারণ মা-বোন ও নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তিনি পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনকে শতভাগ দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। প্রশাসনের ভেতরে থাকা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি দূর না করলে সমাজ থেকে অপরাধ ও সন্ত্রাস নির্মূল করা কখনো সম্ভব হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে মোবারক হোসাইন আগামী ৩১ অক্টোবরের ঘোষিত লংমার্চ কর্মসূচি সফল করার জন্য নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকার, আইনের শাসন এবং বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে সবাইকে শামিল হতে হবে। এই লক্ষ্যে দেশের তরুণ প্রজন্ম, ছাত্রসমাজ, সচেতন নারী সমাজ এবং সাধারণ মেহনতি জনতাকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে নামতে হবে। জনগণের ঐক্যই পারে দেশকে লুটেরা ও দখলদারদের হাত থেকে চূড়ান্তভাবে মুক্ত করতে।















