অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তা ৪ দিনের রিমান্ডে: হোয়াটসঅ্যাপে সরকারবিরোধী তৎপরতা ও অর্থায়নের অভিযোগ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানী থেকে অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের পর চার দিনের পুলিশি রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। রোববার দিবাগত রাতে পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাঁদের আটক করে। গ্রেপ্তারকৃত দুই কর্মকর্তা হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল (৪৭) এবং লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরা (৪৩)। সোমবার বিকেলে তাঁদের ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ডিবির পক্ষ থেকে পল্লবী থানায় দায়ের করা এই মামলায় তাঁদের পাশাপাশি আরও ১০১ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দুই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা নম্বর # ১’ এবং ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ পরিচালনার সরাসরি প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। এসব গ্রুপের মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যে নিয়মিত সরকারবিরোধী তহবিল সংগ্রহ করা হচ্ছিল। দেশের ভেতর ছাড়াও বিদেশ থেকে হাজার হাজার ডলার ($) ও অন্যান্য মুদ্রায় আর্থিক সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে তদন্ত দল। গ্রুপগুলো ব্যবহার করে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত উসকে দেওয়ার মতো বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর ডিজিটাল কনটেন্টও তৈরি করা হতো।

পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের দুটি প্ল্যাটফর্ম ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছিলেন। এসব প্ল্যাটফর্মের আড়ালে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আসামিরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছিলেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংগঠিত ও পুনর্বাসন করার জন্য এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে তাঁরা সংঘবদ্ধভাবে কাজ করছিলেন। এছাড়া দেশি ও বিদেশি নানা গুপ্তচরের সঙ্গেও তাঁদের সরাসরি যোগাযোগের তথ্য মিলেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী কুৎসামূলক প্রচারণাও তাঁদের গ্রেপ্তারের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে পুলিশ। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ‘কালআজকাল.কম’ নামের একটি ফেসবুক পেজ এবং কাজী গুলশান আরার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে নিয়মিত উসকানিমূলক বার্তা ছড়ানো হচ্ছিল। পুলিশের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই আসামিরা বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। সামাজিক মাধ্যমে তাঁদের প্রচারণার প্রায় ১০০% বিষয়বস্তু ছিল আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা তৈরি করা।

গ্রেপ্তারকৃতদের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হিসেবে ২০১৮ সালের একটি আলোচিত ঘটনার কথা আদালতে তুলে ধরেছে পুলিশ। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রায় দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সরাসরি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন গুলশান আরা। পরবর্তীকালে ১০১ জন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। পুলিশ দাবি করেছে, ওই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসামিরা বিভিন্ন টক শো ও সামাজিক মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবজ্ঞা ও ঘৃণা ছড়াচ্ছিলেন।

পল্লবী জোনাল টিমের পরিদর্শক মো. আলী আকবর বাদী হয়ে দণ্ডবিধি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় মামলাটি দায়ের করেছেন। পুলিশ আদালতকে জানায়, ঘটনার পেছনে থাকা ৫টি বিষয়ে জরুরি তথ্য উদ্‌ঘাটন প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে অজ্ঞাত সহযোগী আসামিদের পরিচয় ও অবস্থান নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রদ্রোহের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদের শনাক্ত করা, গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ করা, অপপ্রচারে ব্যবহৃত অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ চিহ্নিত করা এবং অবৈধ অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করা।

আদালতে রিমান্ডের তীব্র বিরোধিতা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। গুলশান আরার আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমান যুক্তি দেন, একটি সাধারণ টক শোতে কথা বলার কারণে কীভাবে দেশ অস্থিতিশীল হতে পারে, আবেদনে তার কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ পুলিশ দেখাতে পারেনি। দেবাশীষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর বলেন, রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হলেও আসামিদের সুনির্দিষ্ট অপরাধের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, আসামিরা পতিত সরকারের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন, তাই তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ জরুরি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ