“শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়”এই স্লোগানকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হলো জাতীয় কন্যাশিশু দিবস-২০২৬। দিবসটি উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় যৌথভাবে নানা বর্ণাঢ্য কর্মসূচির আয়োজন করে। এর মধ্যে ছিল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সুধী সমাবেশ, আলোচনা সভা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। ব্যানার-ফেস্টুন হাতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা র্যালিতে অংশ নিয়ে সচেতনতার বার্তা দেন। সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) দামুড়হুদা উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে উৎসবমুখর পরিবেশে এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) লাভলী ইয়াছমিন। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, কন্যাশিশুরাই দেশের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কোনোভাবেই তাদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে জীবন নষ্ট করা যাবে না। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সমাজে বাল্যবিয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং মেয়েদের জন্য ১০০% নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। তিনি আরও বলেন, সচেতনতার অভাবে এখনও অনেক পরিবার মেয়েদের বোঝা মনে করে, অথচ উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ পেলে মেয়েরাই পরিবারের সবচেয়ে বড় সহায় হয়ে ওঠে। বাল্যবিয়ে রুখতে উপজেলা প্রশাসন মাঠপর্যায়ে সর্বদা কঠোর অবস্থানে থাকবে বলে তিনি সবাইকে সতর্ক করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন বলেন, একটি আদর্শ ও উন্নত সমাজ গড়তে হলে নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান যুগে মেয়েরা ঘরে-বাইরে সমান দক্ষতার সাথে কাজ করছে। তারা দেশে যেমন অবদান রাখছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করে কোটি কোটি ডলার ($) বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। পারিবারিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি ইসলামের আলোকে দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনে নারীর অধিকার রক্ষার বিভিন্ন হাদিস উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা কন্যাশিশুকে উপযুক্ত স্নেহ ও ভালোবাসা দিলে সমাজ থেকে অপরাধ ও অশান্তি দূর হবে এবং প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মোঃ আশরাফুল ইসলাম। এরপর দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেয় দামুড়হুদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ফাহমিদা রহমান এবং দামুড়হুদা পাইলট সরকারি হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র তাহমিদ রহমান বর্ণ। তারা কন্যাশিশুদের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানায়। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত চমৎকার ও সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন দামুড়হুদা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হোসনে জাহান।
আলোচনা সভায় দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাঃ মশিউর রহমান। তিনি কন্যাশিশুদের সুস্বাস্থ্য, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ের শারীরিক ক্ষতি সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সাজ্জাদ হোসেন, দামুড়হুদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক ফাহমিদা পারভীন এবং প্রেস ক্লাবের সভাপতি শামসুজ্জোহা পলাশ। এছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভা শেষে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে সনদপত্র ও আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেন অতিথিবৃন্দ। প্রতিযোগিতায় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ‘ক’ গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করে ফাওযিয়া রহমান মরিয়ম। এ গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান পায় জারিন খান আনিশা এবং তৃতীয় স্থান লাভ করে কানিজ ফাতেমা তোয়া। অন্যদিকে নবম ও দশম শ্রেণির ‘খ’ গ্রুপে প্রথম স্থান অধিকার করে নাজিফা নূর। এই গ্রুপে যথাক্রমে দ্বিতীয় স্থান পায় প্রিয়াছন্দ আহামেদ এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে তাসফিয়া তাবাসসুম।
পুরস্কার পাওয়া শিক্ষার্থীদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে অতিথিরা বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি এ ধরনের সহশিক্ষা কার্যক্রম শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। অভিভাবক ও স্থানীয় সুধীজন প্রশাসনের এমন সময়োপযোগী উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সমাজে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তারা আশাবাদ জানান, সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে দামুড়হুদাকে দ্রুত বাল্যবিয়েমুক্ত একটি আদর্শ উপজেলায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে। সবশেষে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার আহ্বান জানিয়ে সভার সমাপ্তি টানা হয়।















