ভারতে সিইসির পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল দিল্লি: মমতা-কেজরিওয়ালসহ শীর্ষ নেতারা আটক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) নামে কোটি কোটি ভোটারের নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে শনিবার রাজপথে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তরুণদের নেতৃত্বে নতুন গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) রাজধানীর ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর চত্বরে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। তবে এই তরুণদের ডাকে সাড়া দিয়ে বিরোধী দলগুলোও কর্মসূচিতে সমর্থন জানালে পুরো আন্দোলনটি বিশাল রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে। ফলে কর্মসূচি ঠেকাতে পুলিশ শুক্রবার মধ্যরাত থেকেই দিল্লিকে কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঘিরে ফেলে এবং ব্যাপক ধরপাকড় চালায়।

নির্বাচন কমিশনের নেওয়া এই ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম ঘিরে পুরো ভারতজুড়ে তীব্র সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১০০ কোটি নাগরিকের ভোটাধিকার সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব তথ্যানুযায়ী, বিশেষ যাচাই প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩ কোটির বেশি ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। যা মোট ভোটারের প্রায় ১৩% এরও বেশি। বিরোধীদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে একতরফা নির্বাচনী সুবিধা পাইয়ে দিতেই বিরোধী অধ্যুষিত এলাকাগুলো থেকে বেছে বেছে ভোটারদের নাম তালিকা থেকে এভাবে উধাও করে দেওয়া হচ্ছে।

শনিবারের এই বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ভণ্ডুল করতে পুলিশ রাজধানীতে কার্যত জরুরি অবস্থার মতো পরিবেশ তৈরি করে। যন্তর মন্তর অভিমুখী রাস্তাগুলোতে কাঁটাতার ও লোহার ব্যারিকেড বসিয়ে প্রতিটি গাড়িতে তল্লাশি চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। দিল্লির প্রধান মেট্রো স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা হয়। এমনকি বিক্ষোভের তথ্য আদান-প্রদান ব্যাহত করতে রাজধানীর বহু স্পর্শকাতর এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। এর ফলে সাধারণ কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের সারাদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

বিক্ষোভের দিন সকালেই পুলিশ বিরোধী শিবিরের শীর্ষনেতাদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চালায়। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং লাখ লাখ অনুসারী থাকা জনপ্রিয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিসহ দলটির বহু তরুণ নেতাকর্মীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। একই সময় আন্দোলনস্থলে পৌঁছানোর আগেই পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে পুলিশ প্রিজন ভ্যানে তোলে। তবে দীর্ঘ সময় আটক রাখার পর তীব্র প্রতিবাদের মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে বিকেলে ছেড়ে দেওয়া হয়।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই নজিরবিহীন সংকট ক্ষমতাসীন বিজেপিকে এক গভীর উভয়সংকটে ফেলে দিয়েছে। ভারতের প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক দ্য হিন্দু এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভার্গিস কে জর্জের মতে, জ্ঞানেশকে স্বপদে বহাল রাখা কিংবা তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা উভয় পথেই নরেন্দ্র মোদির দলের জন্য চরম রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেই একক আদেশে কোনো সিইসিকে বরখাস্ত করতে পারে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরাতে হলে সংসদের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সাংবিধানিক অভিশংসন প্রস্তাব পাস করতে হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জটিল।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই বিরোধীদের সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের সম্পর্ক ছিল বেশ তিক্ত। এ বছরই বিরোধী দলগুলো লোকসভায় তাঁকে অপসারণের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আনলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে তা পাস হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, জ্ঞানেশকে এখন সরিয়ে দিলে সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পাবে এবং বিরোধীরা নৈতিক বিজয় দাবি করবে। আর তিনি দায়িত্বে থেকে গেলে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে গণআন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়বে। তাছাড়া শত কোটি ডলারের ($) এই বিশাল নির্বাচনী ব্যবস্থার শীর্ষ পদে জ্ঞানেশের পর যিনি আসবেন, তিনি সরকারের প্রতি ১০০% বিশ্বস্ত থাকবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তাও বিজেপিকে ভাবিয়ে তুলছে।

বর্তমান সময়ে তরুণদের রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং অভিজ্ঞ বিরোধী নেতাদের এই যৌথ প্রতিরোধ দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে ভোটার তালিকা থেকে এত বিপুল সংখ্যক নাগরিকের নাম বাদ পড়ার নজির বিরল। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণের এই বিতর্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফলে যন্তর মন্তরের এই বিক্ষোভ আপাতদৃষ্টিতে পুলিশ দিয়ে আটকে দেওয়া হলেও ভোটার তালিকা নিয়ে শুরু হওয়া এই আগুন আগামী দিনগুলোতে ভারতের রাজনীতিকে আরও উত্তাল করে তুলবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ