সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এই রক্তক্ষয়ী হামলায় আহত হয়েছেন আরও ৫০ জনের বেশি মানুষ। মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস হামলার বিষয়ে অবগত কর্মকর্তাদের বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। শনিবারের এই বড় ধরনের আঘাতের পর পরই বিমানবন্দরটির সব উড়োজাহাজ ওঠানামা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আঞ্চলিক সংঘাতের পর উপসাগরীয় কোনো আরব দেশে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা।
হামলার পরপরই এর পুরো দায় প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন হুতিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সৌদি আরবের বিমান হামলার জবাবেই তারা এই প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালিয়েছেন। হুতিদের অভিযোগ, সৌদি বাহিনী সম্প্রতি ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের বাড়িঘর, বাজার, বিয়ের অনুষ্ঠান ও হাসপাতালে শত শত বার বোমাবর্ষণ করেছে। বিশ্বকে এই বার্তা দিতেই তারা রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় আভা বিমানবন্দর এবং আরামকোর জ্বালানি তেল স্থাপনাতেও একই কায়দায় ড্রোন হামলা চালায় গোষ্ঠীটি।
হামলার পর কিং খালেদ বিমানবন্দর এলাকা থেকে বিশাল আগুনের কুণ্ডলী ও ঘন কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। বিস্ফোরণের পরপরই অন্তত ৬টি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত বিমানবন্দরে প্রবেশ করে হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই সৌদি পুলিশ কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করে বিমানবন্দরমুখী সব প্রধান সড়ক বন্ধ করে দেয়। এই হামলার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক রুটেও। বাংলাদেশ বিমানের রিয়াদগামী ২টি গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইটসহ বিভিন্ন দেশের বহু ফ্লাইট সাময়িকভাবে বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রিয়াদে থাকা মার্কিন দূতাবাসসহ পশ্চিমা দূতাবাসগুলো তাদের নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলার কড়া সতর্কতা জারি করেছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন এই হামলার ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সামরিক পদক্ষেপের ব্যাপারে দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেবে। গত বছর হুতিদের ঠেকাতে প্রথম মাসেই প্রায় ১০০ কোটি ডলার অর্থাৎ ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছিল মার্কিন বাহিনী। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও হুতিদের সামরিক শক্তি থামানো যায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন সহায়তাপুষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে সৌদি আরবের রাজধানীতে হুতিদের সফল আঘাত পুরো অঞ্চলে নতুন করে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইয়েমেনের এই সংঘাত মূলত ২০১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া এক দশক পুরোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ধারাবাহিকতা। সম্প্রতি লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজের ওপর হুতিরা কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে সৌদি আরব এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ল। বিশেষ করে গত মাসে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় নেওয়ার পর হুতিরা সামরিকভাবে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে। ফলে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের নতুন সামরিক অভিযানও হুতিদের থামাতে পারছে না।
ধারাবাহিক এই হামলা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক রূপরেখা ও ‘ভিশন ২০৩০’ মহাপরিকল্পনাকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল। যুবরাজ রিয়াদকে বিশ্ব বাণিজ্য, পর্যটন ও বিমান চলাচলের অন্যতম বড় কেন্দ্রে রূপান্তর করতে চান। অথচ আজ রোববার থেকেই সেখানে বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা, যেখানে বহু দেশের শীর্ষ কর্তারা অংশ নেবেন। এ ছাড়া চলতি মাসের শেষের দিকে শত শত কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ টানার লক্ষ্যে আয়োজিত ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামের বার্ষিক সম্মেলনটির নিরাপত্তা নিয়েও এখন বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এক দশকের তীব্র যুদ্ধের ভেতর দিয়ে গিয়ে হুতিরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। তাদের ধ্বংস করার চেয়ে তারা পাল্টা আঘাত হেনে সৌদি আরবের অর্থনীতি, বিমানবন্দর ও তেল খাতের ১০০% স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে বেশি সক্ষম। তাই কূটনৈতিক কোনো সমাধান না এলে কেবল পাল্টা বোমাবর্ষণ করে এই সংঘাত থামানো সম্ভব নয়। বরং রিয়াদের আকাশে ঘন ঘন ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী, অনিয়ন্ত্রিত ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।















