বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই এক অপ্রত্যাশিত সমঝোতার কথা জানালেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করে ডিজেল সরবরাহ সংক্রান্ত একটি বড় চুক্তি সেরেছেন তিনি। এই সমঝোতা অনুযায়ী, রাশিয়া অবিলম্বে বিশ্ববাজারে ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ শুরু করবে। এরপর আগামী নভেম্বর মাসে মস্কো আরও ৫ লাখ টন এবং পরবর্তী ধাপে বাজারে আরও ১০ লাখ টন ডিজেল ছাড়বে। ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ আমেরিকানদের পাশাপাশি সারা বিশ্বের ভোক্তাদের জন্যই ডিজেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে এবং দ্রুত কমতে শুরু করবে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই ওয়াশিংটনে তৎপর হয়ে ওঠে মার্কিন প্রশাসন। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় রাশিয়ার ডিজেল আন্তর্জাতিক ও মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে একটি বিশেষ অস্থায়ী লাইসেন্স জারি করে। এর মাধ্যমে মস্কোর ওপর বহাল থাকা জ্বালানি নিষেধাজ্ঞায় কিছুটা ছাড় দিল যুক্তরাষ্ট্র। মূলত গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের সঙ্গে পুরোদমে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশটিতে ডিজেলের দাম বেড়ে আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হু হু করে বাড়ছে। সামনেই দেশটির গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। ভোটারদের এই তীব্র ক্ষোভ আসন্ন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট ও চাপ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কতটা আকাশচুম্বী হয়েছে, তা স্পষ্ট উঠেছে আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন বা এএএ-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। সংস্থাটির হিসাব বলছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেল কিনতে ক্রেতাদের গড়ে ৬ দশমিক ২৮ ডলার ()খরচকরতেহচ্ছে।অথচকয়েকমাসআগেওচিত্রটিএমনছিলনা।এমনকিগতসেপ্টেম্বরমাসেরশেষভাগেএইদামঅতীতেরসবরেকর্ডভেঙেসর্বোচ্চ৬দশমিক৫৩ডলারে()খরচকরতেহচ্ছে।অথচকয়েকমাসআগেওচিত্রটিএমনছিলনা।এমনকিগতসেপ্টেম্বরমাসেরশেষভাগেএইদামঅতীতেরসবরেকর্ডভেঙেসর্বোচ্চ৬দশমিক৫৩ডলারে() গিয়ে ঠেকেছিল। ডিজেলের এই চরম মূল্যবৃদ্ধির কারণে ট্রাক ভাড়া ও পণ্য পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ কমাতে ট্রাম্প এখন যেকোনো মূল্যে তেলের দাম কমাতে মরিয়া।
হোয়াইট হাউসের এই অপ্রত্যাশিত নমনীয়তাকে মস্কো বেশ ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ দুই দেশের জ্বালানি চুক্তিকে অকুণ্ঠ স্বাগত জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি প্রকাশ্যেই লিখেছেন, ডিজেল ও সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের বোঝাপড়া শুধু তাঁদের নিজেদের নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্যই অত্যন্ত উপকারী হবে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের কড়া নিষেধাজ্ঞার মাঝে এটি মস্কোর জন্য এক বিরাট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিজয়। এর মাধ্যমে জ্বালানি রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হলো রাশিয়ার সামনে।
তবে পুতিন ও ট্রাম্পের এই ঘনিষ্ঠতায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এমন দ্বিমুখী অবস্থানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাদের তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া মানে সরাসরি মস্কোর যুদ্ধবাজ নীতিকে উৎসাহিত করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুতিনকে কোনো উপহার বা সুবিধা দিলে শান্তি ফিরবে না, বরং তা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। তিনি কড়া ভাষায় অভিযোগ করেন, ডিজেল রপ্তানি করে রাশিয়া যে বিপুল অর্থ আয় করবে, তা ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের ওপর আরও বেশি ধ্বংসযজ্ঞ ও সন্ত্রাস চালাতেই খরচ করবে ক্রেমলিন। তাই অনতিবিলম্বে এই ছাড় বাতিলের দাবি জানান তিনি।
এদিকে চুক্তি হলেও বিশ্ববাজারে রাশিয়া আদৌ নির্বিঘ্নে ডিজেল সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বড় সংশয় দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শোধনাগারে ড্রোন হামলা এবং যন্ত্রাংশের সংকটে রাশিয়ায় অভ্যন্তরীণ ডিজেল উৎপাদন এরই মধ্যে প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমে গেছে। উৎপাদন এতটা কমে যাওয়ার পরও মস্কো কীভাবে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাইরের বাজারে অতিরিক্ত ১৮ লাখ টন ডিজেল পাঠাবে, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও ঘরে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ট্রাম্পের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করল।















