মাঠ ছাড়াই অভাবনীয় সাফল্য: গোলাপ অঞ্চলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জাতীয় কাবাডিতে শৈলকুপার মেয়েরা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

উপযুক্ত খেলার মাঠ নেই, নেই আধুনিক কোনো প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম। তবুও প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর অদম্য মনোবলকে পুঁজি করে জাতীয় পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছে ঝিনাইদহের শৈলকুপার অদম্য কিশোরীরা। আন্তঃস্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বকুল অঞ্চলকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে গোলাপ অঞ্চলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে তারা। ফাইনালে শৈলকুপার মেয়েরা প্রতিপক্ষকে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়ে ৫৫-৩২ পয়েন্টের বিশাল জয় তুলে নেয়। এই অনন্য অর্জনের মাধ্যমে দলটি এবার জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লক্ষ্যে কুমিল্লার মাঠে নামার টিকিট নিশ্চিত করেছে।

প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত লড়াইয়ে শুরু থেকেই মাঠে আধিপত্য বজায় রাখে গোলাপ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী শৈলকুপার কিশোরী দল। আক্রমণ ও রক্ষণ দুই বিভাগেই তারা বকুল অঞ্চলের শক্তিশালী দলকে কোনো সুযোগ দেয়নি। প্রথমার্ধ থেকেই পয়েন্টের ব্যবধান বাড়াতে থাকে শৈলকুপার খেলোয়াড়রা। শেষ পর্যন্ত তারা ৫৫ পয়েন্ট তুলে নেয়, বিপরীতে বকুল অঞ্চল সংগ্রহ করে মাত্র ৩২ পয়েন্ট। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের চেয়ে প্রায় ৪১% বেশি পয়েন্ট পেয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে শিরোপা জেতে গোলাপ অঞ্চল। তাদের দারুণ রেইড ও নিপুণ ট্যাকেলে গ্যালারির দর্শকরা মুগ্ধ হন।

বাইরে থেকে এই সাফল্য যতটা চমকপ্রদ মনে হয়, এর পেছনের গল্পটি ততটাই সংগ্রামের। শৈলকুপার এই দলটির নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ নেই। বিদ্যালয় চত্বরে এক টুকরো সমতল জায়গার অভাবে মেয়েরা নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পেত না। গ্রামের কাঁচা রাস্তার পাশে কিংবা ধান কাটা শেষ হওয়া ফসলের জমিতে মাটি সমান করে তাদের অনুশীলন চালাতে হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই সেই বিকল্প জমিও কাদায় ভেসে যেত। আধুনিক ম্যাটের ছোঁয়া তো দূরের কথা, শক্ত খসখসে মাটিতে খালি পায়ে বা সাধারণ কেডস পরেই দিনরাত কঠোর ঘাম ঝরিয়েছে এই ক্ষুদে খেলোয়াড়রা।

দলের প্রায় ৭০% খেলোয়াড়ই এসেছে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবার থেকে। পুষ্টিকর খাবার কিংবা আধুনিক খেলার বুট কেনা অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। যেখানে বিশ্বের বড় বড় ক্রীড়া আসরে খেলোয়াড়দের পেছনে লাখ লাখ ডলার ($) ব্যয় করা হয়, সেখানে শৈলকুপার মেয়েরা ন্যূনতম সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই লড়াই চালিয়ে গেছে। অভাব-অনটনকে পেছনে ফেলে কেবল দেশের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলা কাবাডির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তারা নিয়মিত মাঠে এসেছে। পরিবারের শত বাধা আর রক্ষণশীল সমাজের কটূক্তি উপেক্ষা করে মেয়েদের এই এগিয়ে চলা আজ পুরো জেলাকে গর্বিত করেছে।

দলের প্রধান কোচ ও বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষকের অক্লান্ত পরিশ্রম এই অর্জনের অন্যতম বড় ভিত্তি। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি মেয়েদের আধুনিক কাবাডির বিভিন্ন কৌশল হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। কীভাবে প্রতিপক্ষের শক্ত ডিফেন্স ভাঙতে হয় এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দ্রুত পয়েন্ট ছিনিয়ে নিতে হয়, সেই পাঠ দিয়েছেন তিনি। কোচ জানান, সুযোগ-সুবিধার চরম ঘাটতি থাকলেও মেয়েদের একাগ্রতা ছিল শতভাগ (১০০%)। কোনোদিন অনুশীলনে ফাঁকি দেয়নি তারা। তিনি দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করে বলেন, এই মেয়েরা একদিন জাতীয় কাবাডি দলেও নিজেদের জায়গা করে নেবে।

আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করার পর এবার তাদের সামনে জাতীয় আসরের মহাযজ্ঞ। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দলটির চূড়ান্ত গন্তব্য কুমিল্লা। সেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সেরা চ্যাম্পিয়ন দলগুলোর সঙ্গে শিরোপার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে তারা। জাতীয় আসরে অংশ নিতে যাওয়া ১৪ সদস্যের এই দলটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। খেলোয়াড়রা জানায়, জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নিয়েই তারা এবার ঘরে ফিরতে চায়। প্রথমবারের মতো কুমিল্লার বড় স্টেডিয়ামে ম্যাটের কোর্টে নামার রোমাঞ্চ ছুঁয়ে গেছে দলের প্রতিটি সদস্যকে।

শৈলকুপার মেয়েদের এই অভাবনীয় সাফল্যে স্থানীয় এলাকাবাসী ও ক্রীড়ামোদী মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে শুধু মৌখিক প্রশংসায় সীমাবদ্ধ না থেকে এই প্রতিভাবান দলটির জন্য একটি স্থায়ী খেলার মাঠ এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। জাতীয় মঞ্চে কুমিল্লা জয় করে মেয়েরা যেন দেশের মুখ আরও উজ্জ্বল করতে পারে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা চান অভিভাবকরা। প্রতিকূলতা জয় করে জাতীয় আসরে যাওয়া এই মেয়েরা এখন পুরো বাংলাদেশের মেয়েদের অনুপ্রেরণা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ