ঝিনাইদহের আমতলা বাজারে এক অনন্য প্রতিবাদের চিত্র দেখা গেল। গত ২৭ আগস্ট দুপুরে ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান ‘মগের মুল্লুক’ হোটেলের কর্মচারীরা। মূলত হোটেলের খাবারের মান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছড়ানো অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানাতেই তারা এই মানববন্ধনের ডাক দেন। প্রায় ২০০ জন কর্মচারী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে এই কর্মসূচিটি বিশাল আকার ধারণ করে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে এই প্রতিবাদে সংহতি প্রকাশ করেন।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা হাতে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দেন। তাদের দাবি, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে মগের মুল্লুক হোটেল ঝিনাইদহের ভোজনরসিকদের কাছে আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তারা সবসময় ১০০% টাটকা ও স্বাস্থ্যকর উপকরণ দিয়ে খাবার তৈরি করে থাকেন। কিন্তু সম্প্রতি একটি বিশেষ মহল ব্যবসায়িক প্রতিহিংসার কারণে হোটেলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। এই অপপ্রচারের ফলে হোটেলের নিয়মিত গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে এবং প্রতিদিনের বেচাকেনা প্রায় ২০% থেকে ৩০% কমে গেছে বলে তারা দাবি করেন।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে হোটেলের প্রধান বাবুর্চি বলেন, “আমরা এখানে শুধু চাকরি করি না, আমরা আমাদের গ্রাহকদের পরিবারের সদস্যের মতো মনে করি। খাবারের মান নিয়ে আমরা কখনও আপোষ করি না। অথচ কোনো এক স্বার্থান্বেষী দল বলছে আমাদের খাবার মানহীন। এটি সম্পূর্ণ ডাহা মিথ্যা কথা। আমরা চাই প্রশাসন সত্যটা যাচাই করুক এবং যারা এই গুজব ছড়াচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনুক।” কর্মচারীরা আরও জানান, তাদের আয়ের ওপর প্রায় ৫০টি পরিবারের ৪০০ মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। মিথ্যা প্রচারের কারণে যদি ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
মানববন্ধনে স্থানীয় আমতলা বাজারের ব্যবসায়ীরাও সংহতি প্রকাশ করেছেন। একজন স্থানীয় প্রবীণ ব্যবসায়ী বলেন, “আমি গত ৫ বছর ধরে এই হোটেলে নিয়মিত খাবার খাই। কখনও আমার কোনো শারীরিক সমস্যা হয়নি বা খাবারের বাজে গন্ধ পাইনি। হঠাৎ করে কিছু মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে যে মিথ্যাচার করছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। যারা এসব করছে তারা মূলত এলাকার শান্ত পরিবেশ নষ্ট করতে চায়।” এলাকাবাসী দাবি করেন, হোটেলটির ৮০% গ্রাহকই বাইরের জেলা থেকে আসা পর্যটক বা দূরপাল্লার যাত্রী। তাদের কাছে ঝিনাইদহের সুনাম নষ্ট করার লক্ষ্যেই এমন ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই অপপ্রচার বন্ধ না হয় এবং দোষীদের চিহ্নিত করা না হয়, তবে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি পালন করবেন। তারা ইতোমধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানা গেছে। কর্মচারীরা বলেন, বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বাজারে ব্যবসায় টিকে থাকা অনেক কঠিন, তার ওপর যদি এমন অহেতুক গুজব ছড়ানো হয় তবে স্থানীয় উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হবেন। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোকে সরেজমিনে হোটেলের পরিবেশ ও রান্নাঘর পরিদর্শন করার জন্য খোলা আমন্ত্রণ জানান।
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে হোটেলের প্রতিটি পণ্যের গুণগত মান রক্ষায় তারা বাড়তি সচেতনতা অবলম্বন করছেন। কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একদল অসাধু প্রতিদ্বন্দ্বী এই নোংরা পথ বেছে নিয়েছে। তারা দাবি করেন, মগের মুল্লুক হোটেলের জনপ্রিয়তা এখন ৯৯% ভোজনরসিক মানুষের কাছেই স্বীকৃত। অল্প কিছু মানুষ ভুল তথ্য দিয়ে পুরো ঝিনাইদহের হোটেল শিল্পকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে। তারা সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করেন যেন কেউ ফেসবুকের কোনো পোস্টে যাচাই না করে মন্তব্য বা শেয়ার না করেন।
মানববন্ধন শেষে একটি প্রতিবাদ মিছিল মহাসড়কের কিছু অংশ প্রদক্ষিণ করে। এসময় বক্তারা বলেন, “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। দোষীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক যাতে ভবিষ্যতে কেউ কোনো সৎ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এমন ষড়যন্ত্র করার সাহস না পায়।” পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানানো হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে।
সার্বিকভাবে, ঝিনাইদহের এই মানববন্ধনে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, সাধারণ মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা গুজবে কান না দিয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। মগের মুল্লুক হোটেলের কর্মীরাও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, তারা তাদের সেবার মান আরও বাড়িয়ে অপপ্রচারকারীদের সমুচিত জবাব দেবেন। এলাকার পরিবেশ এখন শান্ত থাকলেও দোষীদের শাস্তির দাবি নিয়ে হোটেলের কর্মী ও স্থানীয়দের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। তারা মনে করেন, প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিলে আবারও হোটেলের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে।
















