মহেশপুরে আধুনিক মিশ্র ফল চাষে বিপ্লব: কৃষকদের নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ মাঠ দিবস

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা এখন ফল চাষের জন্য সারা দেশে এক অনন্য নাম। এই এলাকার মাটি ও আবহাওয়া বিভিন্ন ধরণের বিদেশি ও দেশি ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মহেশপুরের আজমপুর ইউনিয়নের নওদাগ্রামে এক বিশাল কৃষক মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএফের অর্থায়নে এবং শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের বাস্তবায়নে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। মূলত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে ফলের উৎপাদন বাড়ানো যায় এবং খরচ কমানো যায়, সেই লক্ষ্যেই ৫০ জন বড় ফল চাষী ও উদ্যোক্তাদের নিয়ে এই সভা করা হয়। স্মার্ট (SMART) প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে এলাকার কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা গেছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান রিসোর্স পারসন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ হুমায়ুন কবির। তিনি কৃষকদের উদ্দেশে বলেন, বর্তমানে কৃষিতে আধুনিকায়ন জরুরি। আমাদের দেশের কৃষকরা এখন ড্রাগন, আঙুর, মাল্টা, পেয়ারা ও কমলার মতো লাভজনক ফল চাষে ঝুঁকছেন। তবে কেবল চাষ করলেই হবে না, চাষের পদ্ধতিতে ১০০% পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি আরও জানান, রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে যদি জৈব ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, তবে ফলনের মান বহুগুণ বেড়ে যাবে। বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে একজন কৃষক তার উৎপাদন খরচ প্রায় ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারেন।

মাঠ দিবসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় RECP অর্থাৎ রিসোর্স এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন পদ্ধতির ওপর। বক্তারা জানান, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত, তাই পানির সঠিক ব্যবহার এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে চাষাবাদ করতে হবে। বর্তমানে ড্রাগন ফলের বাজারে অনেক প্রতিযোগিতা, তাই বিষমুক্ত ও বড় সাইজের ফল না হলে ভালো দাম পাওয়া কঠিন। এজন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা IPM পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে ক্ষতিকারক পোকা দমনে রাসায়নিক বিষের বদলে প্রাকৃতিক উপায় ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশের জন্য নিরাপদ এবং কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী।

আলোচনা সভায় উপস্থিত আজমপুর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইমরান কাজী বলেন, আমাদের এলাকার কৃষকরা এখন অনেক সচেতন। নওদাগ্রামের এই প্রদর্শনী খামারটি দেখে অন্য কৃষকরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ৫০ জন উদ্যোক্তার মধ্যে ৬ জন শ্রেষ্ঠ ও আদর্শ ফল চাষীকে বাছাই করা হয়। তাদের হাতে আধুনিক কৃষি উপকরণ ও কিট বিতরণ করা হয়, যাতে তারা তাদের খামারগুলোকে আরও স্মার্টভাবে গড়ে তুলতে পারেন। এই কৃষি উপকরণগুলো মূলত পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য সহায়ক হবে। কৃষকরা এই সহযোগিতা পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত এবং তারা মনে করেন এটি তাদের ব্যবসার প্রসারে বড় ভূমিকা রাখবে।

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের স্মার্ট প্রজেক্টের কর্মকর্তারা জানান, তাদের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের শক্তিশালী করা। তারা কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং করেন। বক্তারা উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ফলের বাজারে প্রায় ৪০% থেকে ৫০% চাহিদা স্থানীয়ভাবে পূরণ হচ্ছে। যদি মহেশপুরের মতো অন্যান্য উপজেলাতেও এমন আধুনিক মিশ্র ফল বাগান গড়ে তোলা যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ফল রপ্তানিতেও সক্ষম হবে। অনুষ্ঠানে কৃষকদের সাথে মতবিনিময়ের সময় দেখা যায়, অনেকে ড্রাগন ফলের পাশাপাশি একই জমিতে আঙুর ও মাল্টা চাষ করছেন, যা একটি লাভজনক মিশ্র চাষের উদাহরণ।

মাঠ দিবসের সমাপনী বক্তব্যে বলা হয়, উত্তম কৃষি চর্চা বা GAP মেনে চাষ করলে কৃষকরা সরাসরি সুপারশপগুলোতে তাদের পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন। এতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না এবং কৃষকরা ন্যায্য দাম পাবেন। আধুনিক চাষের ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃষকের বার্ষিক আয় প্রায় ৪০% পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উপস্থিত কৃষকরা জানান, আগে তারা কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে চাষ করতেন, কিন্তু এখন তারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন। এই ধরণের মাঠ দিবস নিয়মিত আয়োজনের মাধ্যমে এলাকার প্রতিটি কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার দাবি জানান তারা।

পরিশেষে, মহেশপুরের নওদাগ্রামে আয়োজিত এই কৃষক মাঠ দিবসটি কেবল একটি অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল কৃষকদের ভাগ্য বদলের এক নতুন দিকনির্দেশনা। শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের টেকনিক্যাল অফিসার এবং এরিয়া ম্যানেজাররা কৃষকদের আশ্বস্ত করেন যে, তারা সবসময় মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পাশে থাকবেন। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আর পরিশ্রমের মাধ্যমে মহেশপুরের এই ফল চাষীরা সারা দেশের জন্য একটি মডেল হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। সফল আলোচনার পর কৃষকদের মাঝে নতুন স্বপ্ন ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়, যা আগামীতে এই এলাকার কৃষি অর্থনীতিকে আরও মজবুত করবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ