ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় ডিজিটাল বিপ্লবের এক নতুন ছোঁয়া লেগেছে। পকেটে নগদ টাকা ছাড়াই এখন কেনাকাটা হবে স্মার্টফোনের মাধ্যমে। এই আধুনিক প্রযুক্তি বা ‘বাংলা QR’ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বুধবার (২৭ আগস্ট) এক বিশাল আয়োজন দেখা গেল। ‘এক দেশ এক QR, লেনদেনে বাংলা QR ক্যাশলেস বাংলাদেশ নির্মাণে’ এই চমৎকার স্লোগান সামনে রেখে শৈলকুপায় একটি বর্ণাঢ্য র্যালি ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শৈলকুপা উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত এই উদ্যোগে এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে।
বুধবার সকাল ১০টার দিকে শৈলকুপা উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে এই বিশেষ কার্যক্রমের সূচনা হয়। সকাল থেকেই শৈলকুপার বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে জড়ো হতে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আয়োজিত এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। র্যালিটি যখন শৈলকুপার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করছিল, তখন সাধারণ মানুষ বেশ আগ্রহ নিয়ে ব্যানারগুলোর দিকে তাকাচ্ছিল। সবার লক্ষ্য একটাই পকেটে টাকার বোঝা না বয়ে স্মার্ট উপায়ে কেনাকাটা করা।
র্যালি শেষে উপজেলা পরিষদ চত্বরেই এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা বলেন, বাংলা QR পদ্ধতিটি মূলত সাধারণ মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে। সাধারণত বিভিন্ন অ্যাপের জন্য আলাদা আলাদা QR কোড ব্যবহার করতে হতো, কিন্তু বাংলা QR-এর মাধ্যমে এখন যেকোনো ব্যাংকের অ্যাপ বা এমএফএস (বিকাশ, নগদ ইত্যাদি) দিয়ে একটিমাত্র কোড স্ক্যান করেই টাকা প্রদান করা যাবে। এতে ব্যবসায়ীদের যেমন সুবিধা হবে, তেমনি গ্রাহকদেরও ১০০% নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে টাকা হারানোর ভয় বা জালনোটের কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না।
আলোচনায় জানানো হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে ক্যাশলেস বা নগদহীন লেনদেনের গুরুত্ব দিনদিন বাড়ছে। বর্তমান সময়ে প্রায় ৭০% মানুষ ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। শৈলকুপার মতো উপজেলাগুলোতে যদি ছোট ছোট দোকানেও এই QR কোড পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে এলাকার অর্থনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসবে। ব্যবসায়ীরা এখন কোনো খরচ ছাড়াই তাদের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি টাকা গ্রহণ করতে পারবেন। নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি না থাকায় লেনদেনের সময় চুরি বা ছিনতাইয়ের সম্ভাবনা ৯৯% কমে যায়। এছাড়া প্রতিটি লেনদেনের হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকে বলে হিসাব রাখা সহজ হয়।
মতবিনিময় সভায় আরও বলা হয়, ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে খুচরা দোকানদার, রিকশাচালক বা সবজি বিক্রেতাদের এই ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে দেশের জিডিপিতে এর বড় প্রভাব পড়বে। সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক লেনদেনের ফলে কালোটাকার লেনদেন বন্ধ হবে এবং প্রতিটি টাকার সঠিক গন্তব্য নিশ্চিত হবে। বাংলা QR-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। গ্রাহককে এখন ৫-১০টি আলাদা কোম্পানির QR কোড খুঁজতে হবে না, মাত্র ১টি কোডই সব সমস্যার সমাধান দেবে।
উপস্থিত বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, শৈলকুপার প্রতিটি ইউনিয়নে এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে তারা কাজ করছেন। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বা দোকানে দোকানে গিয়ে বাংলা QR ইনস্টল করে দেবে। এর মাধ্যমে একজন কৃষকও তার ফসলের দাম সরাসরি ব্যাংক একাউন্টে পেতে পারেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমে যাবে। ব্যাংক কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শৈলকুপার ৮০% থেকে ৯০% লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ১০০০/- টাকা থেকে শুরু করে যেকোনো অঙ্কের পেমেন্ট করা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ।
শৈলকুপার এই র্যালি ও মতবিনিময় সভায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, তারা অনেক সময় খুচরা পয়সা বা টাকার ভাঙতি নিয়ে বিপাকে পড়েন। ডিজিটাল লেনদেনে এই ঝামেলার কোনো সুযোগ নেই। তারা মনে করছেন, বাংলা QR পদ্ধতি চালু হলে তাদের ব্যবসায়িক পরিচালনা অনেক সহজ হয়ে যাবে। সাধারণ গ্রাহকরাও এখন থেকে টাকা বহনের বদলে স্মার্টফোন দিয়েই তাদের নিত্যদিনের খরচ মেটাতে পারবেন। প্রযুক্তির এই সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে উপজেলা প্রশাসনও সব ধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে শৈলকুপার এই উদ্যোগ একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। ক্যাশলেস লেনদেন কেবল সময়ের দাবিই নয়, এটি একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম চাবিকাঠি। র্যালি ও মতবিনিময় সভাটি সফলভাবে শেষ হওয়ার পর ব্যাংক কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, খুব দ্রুতই শৈলকুপার প্রতিটি ছোট-বড় বাজারে বাংলা QR-এর ব্যবহার শুরু হবে। এতে শৈলকুপা উপজেলা ঝিনাইদহ জেলার মধ্যে একটি আদর্শ ক্যাশলেস উপজেলা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।
















