যশোরে শিশু খাদ্যে মারাত্মক কারসাজি: পুলেরহাটে ডিলারকে ১ লাখ টাকা জরিমানা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যশোরের পুলেরহাট বাজারে শিশু খাদ্যে ভেজাল ও অনিয়মের অভিযোগে এক বড় অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সোমবার দুপুরের এই অভিযানে তানসীপ ট্রেডার্স নামের একটি নামী শিশু খাদ্যপণ্য ডিলার প্রতিষ্ঠানকে নগদ ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শিশুদের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা না করে কেবল মুনাফার লোভে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন খাদ্যপণ্য মজুদ রাখার প্রমাণ পাওয়ায় এই কঠোর ব্যবস্থা নেয় প্রশাসন। এই অভিযানটি পরিচালনা করেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যশোরের কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান। অভিযানের সময় পুলেরহাট বাজারের সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং অনেকেই প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানান।

অভিযানের শুরুতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের টিমটি পুলেরহাট বাজারের বিভিন্ন দোকান ও গুদাম পরিদর্শন করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে যে, তানসীপ ট্রেডার্স নামের ওই প্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য আমদানিকৃত খাবারে ব্যাপক অনিয়ম চলছে। এরপর তল্লাশি শুরু করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, শত শত প্যাকেটে কোনো বৈধ আমদানিকারকের স্টিকার নেই, এমনকি অনেক পণ্যের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। শিশুদের জন্য তৈরি এই স্পর্শকাতর খাবারে এমন অবহেলা দেখে কর্মকর্তারা হতবাক হয়ে যান। তারা সাথে সাথেই ডিলার মালিককে তলব করেন এবং আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান জানান, তানসীপ ট্রেডার্সে গিয়ে তারা দেখেন যে পণ্যের গায়ে কোনো যথাযথ মোড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে না। একটি পণ্যের গুণমান নিশ্চিত করতে যে ধরণের লেবেলিং বা মোড়ক দরকার, তার ১০০% এখানে অনুপস্থিত ছিল। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে নিজস্ব উপায়ে কিছু খাদ্যপণ্য উৎপাদন করছিল, যার জন্য তাদের কাছে কোনো সরকারি অনুমোদন বা লাইসেন্স ছিল না। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের স্তূপ। শিশুদের শরীরে এই ধরণের মেয়াদহীন খাবার গেলে তা বড় ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকি এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এই ভয়াবহ অনিয়মের কারণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ অনুযায়ী তাদের ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

পুলেরহাট বাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শিশুদের খাবারের ওপর আমাদের ৮০% থেকে ৯০% আস্থা থাকে নামী ডিলারদের ওপর। কিন্তু সেই ডিলাররাই যদি এমন প্রতারণা করে, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যরা জানান, এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ দিন ধরে বাজারে নিম্নমানের শিশু খাদ্য সরবরাহ করে আসছিল। প্রশাসন এখন তাদের ওপর কড়া নজরদারি রাখছে। জরিমানার পাশাপাশি তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে একই ধরণের অপরাধ করলে তাদের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করা হবে এবং কারখানা সিলগালা করে দেওয়া হবে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এই অভিযানে কেবল তানসীপ ট্রেডার্স নয়, আরও বেশ কিছু মুদি দোকান ও বেকারিও পরিদর্শন করা হয়। সেখানে দেখা যায় অনেক ব্যবসায়ী পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ১০% থেকে ১৫% বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। তাদেরও সতর্ক করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত বাজার তদারকি করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বিশেষ করে শিশু খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা ০% টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। কোনো অসাধু ব্যবসায়ীকে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না।

বর্তমানে বাজারে খাদ্যে ভেজালের হার অনেকটা বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। সোমবারের এই অভিযানের ফলে যশোরের অন্যান্য ডিলারদের মধ্যেও এক ধরণের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সচেতন অভিভাবকরা বলছেন, আমাদের সন্তানদের সুরক্ষার জন্য প্রশাসনের এমন আকস্মিক অভিযান সপ্তাহে অন্তত ২ থেকে ৩ বার হওয়া উচিত। অনেক সময় দেখা যায় অভিযানে জরিমানা করার কয়েক দিন পরই ব্যবসায়ীরা আবারও পুরনো অভ্যাসে ফিরে যান। তাই জেল-জরিমানার পাশাপাশি সামাজিক বয়কট এবং নিয়মিত তদারকিও খুব জরুরি। প্রশাসন জানিয়েছে, এই ১ লাখ টাকা জরিমানা কেবল একটি শুরু, বড় বড় রাঘব বোয়ালদের ধরতে তাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

যশোরের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জেলার প্রতিটি উপজেলায় এই ধরণের বাজার মনিটরিং টিম কাজ করছে। বিশেষ করে দুধ, বিস্কুট এবং শিশুদের ফর্মুলা দুধের মান যাচাই করতে তারা ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ব্যবস্থাও করছেন। সোমবারের অভিযানে তানসীপ ট্রেডার্স থেকে জব্দ করা কিছু নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। যদি সেখানে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়, তবে মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন সর্বদা সজাগ রয়েছে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পরিশেষে, পুলেরহাট বাজারের এই অভিযান একটি সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়েছে। শিশুদের খাবার নিয়ে ব্যবসায়ীদের এই অমানবিক আচরণ সত্যিই দুঃখজনক। ১ লাখ টাকা জরিমানার মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, আইন সবার জন্য সমান। এখন দেখার বিষয় হলো, এই শাস্তির পর ব্যবসায়ীরা কতটা সচেতন হন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আশা করছে যে, সাধারণ ক্রেতারাও সচেতন হবেন এবং কোনো পণ্য কেনার আগে তার মেয়াদ ও সিল ঠিক আছে কিনা তা ১০০% নিশ্চিত করে নেবেন। কোনো প্রকার অনিয়ম দেখলেই স্থানীয় প্রশাসনকে জানানোর জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ