প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে নিজের কলিজার টুকরোকে হত্যা: মৌলভীবাজারে পাষণ্ড বাবার ফাঁসির রায়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে এক ভয়াবহ ও পৈশাচিক ঘটনার বিচার শেষ হলো দীর্ঘ ১২ বছর পর। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশীকে শায়েস্তা করতে নিজের মাত্র সাড়ে তিন বছরের শিশুকন্যা রুনা বেগমকে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিলেন তার বাবা শরীফ আলী। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত এই ঘাতক পিতাকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫০,০০০/- টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন। আদালতের এই রায়ে এলাকায় স্বস্তি ফিরলেও এক বাবার এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে এখনো স্তম্ভিত সাধারণ মানুষ।

ঘটনার শুরু আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে, ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভানুবিল গ্রামে তখন গভীর রাত। ঘড়িতে সময় আনুমানিক রাত ৩:০০টা। সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন নিজ ঘরে ঘুমন্ত শিশু রুনার ওপর ধারালো দা নিয়ে চড়াও হন তার জন্মদাতা বাবা শরীফ আলী। মাত্র ৩.৫ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে তিনি নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেন। কোনো বাইরের শত্রু নয়, বরং নিজের গর্ভজাত সন্তানকে তিনি বিসর্জন দিলেন শুধু একটুখানি জমির লোভে আর প্রতিহিংসার আগুনে।

পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। শরীফ আলীর সাথে তার চাচাতো ভাই ও প্রতিবেশী সালেক মিয়ার জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। শরীফ আলী ভেবেছিলেন, যদি নিজের মেয়েকে মেরে তার দায় সালেক মিয়ার ওপর চাপানো যায়, তবে সালেক মিয়াকে সারাজীবনের জন্য জেল খাটানো যাবে। এই ১০০% ভুল এবং নিষ্ঠুর পরিকল্পনা থেকেই তিনি নিজের মেয়েকে হত্যার ছক কষেন। তিনি চেয়েছিলেন এক ঢিলে দুই পাখি মারতে—জমি দখল এবং শত্রুকে বিনাশ করা। কিন্তু আইনের হাত থেকে তিনি নিজেকে বাঁচাতে পারেননি।

তবে সত্য কখনো চাপা থাকে না। ঘটনার পর শরীফ আলী প্রতিবেশীদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করলেও তার স্ত্রী নেকজান বিবি বিষয়টি বুঝতে পারেন। নিজের চোখের সামনে মেয়ের নিথর দেহ দেখে একজন মা হিসেবে তিনি স্থির থাকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত স্বামীর বিরুদ্ধেই কমলগঞ্জ থানায় মামলা করেন তিনি। পুলিশ তদন্তে নেমে শরীফ আলীর অসংলগ্ন কথাবার্তায় নিশ্চিত হয় যে, খুনী ঘরের ভেতরেই আছে। এরপর গ্রেফতার হওয়ার পর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে নিজের অপরাধ কবুল করেন শরীফ আলী। সেখানে তিনি বর্ণনা করেন কীভাবে নিজের সন্তানকে তিনি হত্যা করেছেন।

মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে আদালত বিভিন্ন সাক্ষীর বয়ান ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই করেন। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে আইনি লড়াই চলার পর সোমবার বিচারক মোঃ আনোয়ারুল হক চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, যে বাবা তার সন্তানের রক্ষক হওয়ার কথা, সেই যখন ভক্ষক হয়, তখন সমাজের নৈতিক অবক্ষয় কত নিচে নামতে পারে তা ভাবা যায় না। এই অপরাধীর জন্য কোনো দয়া দেখানোর সুযোগ নেই, তাই তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

রায়ের সময় আদালত কক্ষে এক থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল। দণ্ডপ্রাপ্ত শরীফ আলীকে যখন পুলিশ ভ্যানে করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন উপস্থিত সাধারণ মানুষ তার প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেন। স্থানীয়রা বলছেন, এই রায় সমাজের জন্য একটি কড়া বার্তা। জমির মতো তুচ্ছ জিনিসের জন্য নিজের সন্তানকে কোরবানি দেওয়ার মতো বিকৃত মানসিকতার মানুষ যেন আর তৈরি না হয়, এই রায় তা নিশ্চিত করবে। জরিমানার ৫০,০০০/- টাকাও তাকে পরিশোধ করতে হবে বলে আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।

কমলগঞ্জের এই হত্যাকাণ্ড সে সময় পুরো মৌলভীবাজার জেলাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ১২ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও পূর্ব ভানুবিল গ্রামের মানুষের মনে দগদগে। শিশু রুনার মা নেকজান বিবি রায়ের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “বিচার পেতে অনেক দেরি হয়েছে, কিন্তু আমি খুশি যে আমার মেয়ের খুনিকে আদালত শাস্তি দিয়েছেন। একজন বাবা যে এতটা পাষণ্ড হতে পারে, তা আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি।” এই রায়ের মাধ্যমে সত্যের জয় হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

বর্তমানে দেশে অপরাধের মাত্রা যে হারে বাড়ছে, তাতে এই ধরণের কঠোর বিচার খুবই প্রয়োজন। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মৃত্যুদণ্ডের আদেশ কার্যকর হলে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ করার আগে মানুষ অন্তত ১০০ বার ভাববে। নিজ স্বার্থের জন্য পবিত্র বাবা-মেয়ের সম্পর্ককে কলঙ্কিত করা শরীফ আলীর এই শাস্তি যেন প্রতিটি অপরাধীর জন্য এক বড় শিক্ষা হয়। পুলিশ ও প্রসিকিউশন টিমের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই দীর্ঘ এক যুগ পর হলেও ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ