রংপুরে শিক্ষক পরিবার খুনের নেপথ্যে কি কেবলই ইয়াবা? পুলিশের দাবিতে স্বজনদের ঘোর সন্দেহ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রংপুর নগরীর কামালকাছনা এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে। পুলিশ দাবি করছে, নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় ওই দুই তরুণ একে একে চারজনকে খুন করেছে। তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ নিহতের স্বজনেরা। তারা বলছেন, মাত্র দুজন কম বয়সী তরুণ কীভাবে চারজন মানুষকে এভাবে কাবু করে ফেলল, তা নিয়ে বড় ধরণের রহস্য রয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রতিবেশী দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে।

গত শনিবার রাতে কামালকাছনা এলাকার তিনতলা বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) লাশ উদ্ধার করা হয়। রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, ইয়াবা সেবনের বিরোধ থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশ বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের ভবন দিয়ে গণপতির বাড়ির ছাদে উঠে ইয়াবা খাচ্ছিল। গণপতি বাধা দিলে তাকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর চিৎকার শুনে স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে আসার চেষ্টা করলে তাদেরও সিঁড়িতেই মেরে ফেলা হয়। সবশেষে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ছোট ছেলে আয়ুশকেও খুন করে তারা।

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, খুনিরা এতটাই ঠান্ডা মাথার ছিল যে হত্যার পর তারা ওই বাড়িতেই গোসল করে এবং ফ্রিজ থেকে শসা ও খেজুর বের করে খায়। এমনকি তারা পুনরায় ইয়াবা সেবন করে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় এলাকা ত্যাগ করে। যাওয়ার আগে আলমারি ও ড্রয়ার তছনছ করে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করে তারা। পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তারকৃত সিদ্ধার্থ একটি গয়নার দোকানে কাজ করত এবং মুগ্ধ মাছের দোকানে কাজ করত। তাদের কাছ থেকে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম পাওয়ার দাবিও করেছে পুলিশ।

তবে নিহতের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের এই বয়ানকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। নিহতের বড় ভাইয়ের জামাতা বিশ্বজিৎ রায় গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশের দাবি অনুযায়ী দুই তরুণ চারজন মানুষকে একা সামাল দিতে পারে বলে তারা বিশ্বাস করেন না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাড়ির ভেতরে চারজন মানুষের সাথে ধস্তাধস্তি বা চিৎকারের শব্দ কেউ কেন শুনতে পেল না? এছাড়া খুনিদের শারীরিক গঠন দেখেও তাদের পক্ষে চারজনকে খুন করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্বজনেরা। নিহতের স্বজনদের আশঙ্কা, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই মাদকসেবী বলে পুরো বিষয়টি চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না।

গ্রেপ্তারকৃতদের পরিবারও স্তম্ভিত এই ঘটনায়। সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাস স্বীকার করেছেন তার ছেলে নেশা করত, কিন্তু সে খুন করতে পারে না বলে তিনি দাবি করেন। একই কথা বলেছেন মুগ্ধর মা সেনা দাসও। তাদের মতে, নেশা করা আর চারজন মানুষকে একে একে মেরে ফেলা এক জিনিস নয়। এলাকার সাধারণ মানুষও এই হত্যাকাণ্ডের ধরণ দেখে বিষ্মিত। মাত্র দুজন মাদকসেবী কোনো অস্ত্র ছাড়াই গামছা ও দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে চারজনকে এভাবে নিঃশব্দে হত্যা করেছে, এটি সাধারণ মানুষের কাছেও রহস্যজনক মনে হচ্ছে।

গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের একজন জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী সবে স্নাতকোত্তর শেষ করেছিলেন এবং ছেলে আয়ুশ ছিল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। এই মেধাবী পরিবারটির এমন করুণ পরিণতিতে পুরো রংপুর শহর ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। রবিবার জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন একটাই প্রশ্ন—নিজের বাড়িতেও কি মানুষ ১০০% নিরাপদ নয়?

বর্তমানে পুলিশ মামলাটিকে আরও গভীরভাবে তদন্ত করার আশ্বাস দিয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত দুজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, মাদকের ভয়াবহতা বর্তমানে ৮০% থেকে ৯০% অপরাধের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই খুনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং নেপথ্যে অন্য কেউ আছে কি না, তা বের করা এখন পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রংপুরের এই হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদকের বিস্তারের দিকে নতুন করে আঙুল তুলছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ