কোটচাঁদপুরে আপন চাচাত ভাইদের নির্মমতায় প্রাণ হারালেন মানসিক ভারসাম্যহীন তবিবর

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আপন চাচাত ভাইদের ধারালো দায়ের কোপে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৫ বছর বয়সী তবিবর রহমান। রবিবার সকাল ঠিক ৬:৩০ মিনিটের দিকে উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামের সাপমারি মাঠে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। নিহত তবিবর রহমান ওই গ্রামেরই বাসিন্দা নবী উদ্দিন মন্ডলের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। পারিবারিক তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়, যার শিকার হতে হয় অসহায় এই মানুষটিকে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের ভাই জিয়ার রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকালে এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবিবর রহমান হঠাৎ করেই তার চাচিকে একটি লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। বিষয়টি জানতে পেরে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তবিবরের চাচা গফুর হোসেন এবং তার দুই ছেলে শাকিল হোসেন ও উজির হোসেন। তারা তবিবরকে মারতে দা ও লাঠি নিয়ে তাড়া করেন। প্রাণভয়ে তবিবর দৌড়ে গ্রামের পাশে সাপমারি মাঠে চলে যান। কিন্তু পিছু ছাড়েনি ঘাতক চাচা ও ভাইয়েরা। মাঠে তাকে ধরে ফেলে প্রথমে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটানো হয় এবং একপর্যায়ে চাচা গফুর হোসেনের হাতে থাকা দা দিয়ে তার পেটে সজোরে কোপ দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলেই ১০০% নিশ্চিত মৃত্যু হয় তবিবরের।

তবিবর রহমানের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পটি বেশ করুণ। প্রতিবেশী শিমুল হোসেন জানান, একটা সময় তবিবর এলাকার অন্যতম মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও তিনি দারুণ পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেলে তিনি প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা পান। প্রায় ২০ বছর আগে থেকে তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। এরপর থেকে তিনি অনেকটা নিজের মধ্যেই থাকতেন। এলাকার মানুষ তাকে শান্ত স্বভাবের হিসেবেই জানত, যদিও মাঝেমধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করতেন। সেই মানুষটিকেই এভাবে জীবন দিতে হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরিবারের ভেতরেও দ্বিমুখী বক্তব্য পাওয়া গেছে। নিহতের ভাই জিয়ার রহমান সরাসরি চাচা ও চাচাত ভাইদের অভিযুক্ত করলেও মামাত ভাই আব্দুল কুদ্দুসের বক্তব্য কিছুটা ভিন্ন। কুদ্দুস জানান, তবিবরের বড় ভাই জিয়ার রহমানের সাথে চাচার পরিবারের জমিজমা নিয়ে আগে থেকেই শত্রুতা ছিল। সেই সুযোগ নিতেই হয়তো খুনের দায়ে সবাইকে জড়ানো হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, ঘাতক মূলত শাকিল হোসেন। শাকিলই রাগের মাথায় তার ভারসাম্যহীন ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। জমিজমা নিয়ে এই বিরোধের জেরে পরিবারটির মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

হত্যাকাণ্ডের পরপরই পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ঘাতক শাকিল হোসেন, উজির হোসেন এবং তাদের বাবা গফুর হোসেন বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। ঘটনার পর থেকে তাদের পরিবারের কোনো সদস্যের দেখা পাওয়া যায়নি। তবিবরের ছোট দুই ছেলে ও এক মেয়ে এখন বাবার জন্য শোকে কাতর। ভারসাম্যহীন হলেও সন্তানদের কাছে তবিবর ছিলেন পরম আশ্রয়ের জায়গা। খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে এলাকাবাসী ফুঁসে উঠেছেন। স্থানীয়রা বলছেন, মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে এভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মারা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমান গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, জমিজমা সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের কোন্দলই এই খুনের নেপথ্য কারণ। তিনি জানান, পুলিশ খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ পাঠানো হয়েছে মর্গে। ওসি আরও বলেন, আমরা জানতে পেরেছি খুনি মূলত শাকিল হোসেন। তবে এখনো পর্যন্ত খুনিদের কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের কয়েকটি দল আসামিদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। যদিও এখন পর্যন্ত নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত কোনো অভিযোগ করা হয়নি, তবে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই ঘটনার পর থেকে মল্লিকপুর গ্রামে শোক ও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গ্রামের মোড়ে মোড়ে মানুষের মুখে একটাই আলোচনা—জমিজমা আর রাগের মাথায় কত সহজে মানুষ খুনি হয়ে ওঠে। তবিবরের মতো একজন অসহায় মানুষকে মেরে ফেলাটা সমাজের পতনকেই নির্দেশ করে। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশ যেন দ্রুত ঘাতকদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, এই খুনের পেছনে সুপরিকল্পিত কোনো চক্রান্ত ছিল কি না, তাও তদন্ত করে দেখা উচিত।

পরিশেষে বলা যায়, পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব এবং আইনি সচেতনতা না থাকায় তুচ্ছ বিষয়ে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটছে। জমিজমার দখল নিয়ে গ্রামীণ জনপদে অপরাধমূলক ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। তবিবর রহমানের এই করুণ পরিণতি আবারো মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সহনশীলতা ও মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে সমাজ থেকে। এখন এলাকাবাসী কেবল ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন যাতে দোষীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায় এবং তবিবরের আত্মা শান্তি পায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ