চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলায় আজ এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সকালের শান্ত পরিবেশ হঠাতই বিষাদে রূপ নেয় যখন তিনটি মোটরসাইকেলের মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে। এই দুর্ঘটনায় শাহিন (৩০) নামের এক যুবক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও ৩ জন গুরুতরভাবে জখম হয়েছেন। আজ ২৩ আগস্ট রবিবার, সকাল ৮:২০ মিনিটের দিকে দামুড়হুদা ব্রিজ সংলগ্ন মোড়ে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনাটি ঘটে। নিহতের পরিবার এবং এলাকাবাসীর মধ্যে এখন শোকের মাতম চলছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতোই দামুড়হুদা ব্রিজ মোড়ে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছিল। ঠিক সেই সময় তিনটি মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে তিন দিক থেকে এসে মোড়ের মুখে একে অপরের সাথে সজোরে ধাক্কা খায়। সংঘর্ষের শব্দ এতটাই বিকট ছিল যে আশপাশের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই ৪ জন মোটরসাইকেল আরোহী ছিটকে পড়ে রক্তাক্ত হন। রাস্তার পিচঢালা পথ মুহূর্তের মধ্যেই লাল হয়ে ওঠে এবং দুর্ঘটনাকবলিত মোটরসাইকেলগুলোর যন্ত্রাংশ দুমড়ে-মুচড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
নিহত শাহিন দামুড়হুদা উপজেলার চিৎলা কবরস্থান পাড়ার বাবলুর ছেলে। মাত্র ৩০ বছর বয়সেই তার জীবনের প্রদীপ নিভে গেল। শাহিন পেশাগত কারণে সকালে বের হয়েছিলেন, কিন্তু পথেই ওত পেতে ছিল যমদূত। দুর্ঘটনায় আহত বাকি ৩ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টাফ ফার্মাসিস্ট মোঃ ফিরোজ হোসেন (৩২), একই প্রতিষ্ঠানের অফিস স্টাফ মোঃ জনি (৪২) এবং দামুড়হুদা মন্দির পাড়ার রবিন জেলের ছেলে পেশায় রঙ মিস্ত্রি নিষ্কলঙ্ক (৪০)। আহতদের প্রত্যেকের অবস্থাই সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার সাথে সাথে স্থানীয় লোকজন ১০০% মানবিকতা দেখিয়ে দ্রুত উদ্ধার কাজে নেমে পড়েন। তারা আহতদের উদ্ধার করে প্রথমেই দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে শাহিনসহ সবার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের জরুরি ভিত্তিতে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর মানুষের আহাজারিতে তখন পুরো হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল।
দুর্ভাগ্যবশত চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহিন মারা যান। চিকিৎসকরা জানান, তার মাথায় ও বুকে প্রচণ্ড আঘাত লেগেছিল এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। শাহিনের মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছালে মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, বাকি ৩ জন বর্তমানে সদর হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। আহতদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক খরচ হিসেবে প্রায় ১০,০০০৳ থেকে ১৫,০০০৳ টাকা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যয় করতে হয়েছে এবং আরও বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
দামুড়হুদা থানা পুলিশ জানিয়েছে, খবর পাওয়ার পরপরই তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান চলাচল স্বাভাবিক করেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মোটরসাইকেলগুলোর গতি সম্ভবত ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার ছিল। অতিরিক্ত গতির কারণেই বাঁক নেওয়ার সময় চালকরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। স্থানীয়দের দাবি, এই ব্রিজ মোড়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এখানে ট্রাফিক সংকেত বা স্পিড ব্রেকার না থাকায় প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনার হার প্রায় ২০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা দ্রুত এখানে গতিরোধক স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।
নিহত শাহিনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই দুর্ঘটনা চুয়াডাঙ্গার মানুষের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। সড়ক পথে বেপরোয়া গতি আর অসতর্কতা যে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, শাহিনের মৃত্যু তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে।
এদিকে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সমাজসেবীরা। তারা বলছেন, হেলমেট ব্যবহার না করা এবং বেপরোয়া বাইক চালানোই এই ধরনের দুর্ঘটনার মূল কারণ। শাহিনের মতো আর কাউকে যেন অকালে প্রাণ হারাতে না হয়, সেই লক্ষ্যে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি। আজকের এই দুর্ঘটনা পুরো চুয়াডাঙ্গা জেলায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
















