যশোরে বিএনপি নেতা রড বাচ্চুর ‘ত্রাস’: বোমা হামলা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় ১৫ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের চার্জশিট

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যশোরের শহরতলী খোলাডাঙ্গা এলাকায় এক গৃহবধূর বাড়িতে বোমা হামলা এবং তাকে সপরিবারে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আরবপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বাচ্চু মিয়া ওরফে ‘রড বাচ্চু’সহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার এসআই অমৃত দাস দীর্ঘ তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে নানা অপরাধের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে এই প্রতিবেদন পেশ করেন। এই খবর জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের তালিকায় রড বাচ্চুর তিন ছেলে—মেহেদী হাসান, জাহিদ হাসান শাওন ও তারেক হাসান অন্তরের নামও রয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন—হাসান কবির সাগর, মুজিদ ওরফে মুজিত মিয়া, সেলিম বিশ্বাস ওরফে কুটি, পারভেজ, সাব্বির হোসেন, রুবেল, জাফর আলী সিদ্দিক ওরফে জামাই, বিপ্লব হোসেন, রাকিব, আব্দুল আল মামুন এবং সুমন ওরফে ‘গান্ডু সুমন’। পুলিশ তদন্তে দেখতে পেয়েছে, বাচ্চু মিয়ার নেতৃত্বে এই চক্রটি এলাকায় একটি নিজস্ব রাজত্ব কায়েম করেছে এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, জমি সংক্রান্ত বিরোধ মেটানোর কথা বলে অর্থ আত্মসাৎই ছিল এই সংঘাতের মূল কারণ। খোলাডাঙ্গার বাসিন্দা রুবির স্বামী সলেমান গাজী মারা যাওয়ার পর তার পৈতৃক জমি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। সেই জমি উদ্ধার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাচ্চু মিয়া ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট রুবির কাছ থেকে নগদ ৪,০০,০০০৳ (চার লাখ টাকা) নেন। টাকা নেওয়ার সেই দৃশ্যটি ভিডিও ফুটেজে সংরক্ষিত রয়েছে, যা পুলিশ প্রমাণ হিসেবে পেয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও বাচ্চু জমি উদ্ধার করে দিতে পারেননি এবং টাকা ফেরত চাইলে তিনি টালবাহানা শুরু করেন।

টাকা ফেরত চাওয়ায় গত ১৫ জুন রাত ৯:৩০ মিনিটের দিকে রড বাচ্চুর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র ও হাতবোমা নিয়ে রুবির বাড়িতে হামলা চালায়। রুবি ও তার পরিবারের সদস্যরা প্রাণভয়ে ঘরের ভেতরে আত্মগোপন করলে সন্ত্রাসীরা বাড়ির ওপর লক্ষ্য করে হাতবোমা ছুড়ে মারে। এতে অল্পের জন্য ৫-১০ জন মানুষের প্রাণ রক্ষা পায়। পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, এই হামলা ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং রুবিকে হত্যার উদ্দেশ্যেই তারা সেখানে গিয়েছিল।

শুধু রুবির পরিবার নয়, এলাকার সাধারণ মানুষও রড বাচ্চুর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। স্থানীয়দের মতে, রুবির মামলায় প্রতিবেশী ইউনুস আলী সাক্ষী হওয়ায় তার ছেলে ইয়াসিন ইসলাম অহিকে অপহরণ করে বাচ্চুর টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অহিকে বিদ্যুতের শক দিয়ে ১০০% মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এই নৃশংস ঘটনার পর কোতোয়ালি থানায় পৃথক একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এলাকার কোনো জমি কেনাবেচা বা বিরোধ মীমাংসা করতে গেলেই বাচ্চুকে ৫% থেকে ১০% কমিশন দিতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও রড বাচ্চুর উত্থান বেশ নাটকীয়। স্থানীয়রা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি একজন সাধারণ রড মিস্ত্রি ছিলেন এবং পরে ছোটখাটো ঠিকাদারি কাজ করতেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি হঠাৎ করেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। আগে ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি থাকলেও সভাপতি মুনতাজির রহমানের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত সভাপতির পদ দখল করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই পদ ব্যবহার করে তিনি এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং বোমাবাজির রাজত্ব কায়েম করেছেন। গত কোরবানির ঈদে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে বোমা ফাটালে ২ জন নিষ্পাপ শিশু গুরুতর আহত হয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এলাকাবাসী চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসায় স্থানীয়রা এখন দ্রুত বিচার দাবি করছেন। তবে রড বাচ্চু ও তার বাহিনীর ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। তাদের মতে, এলাকায় মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি বর্তমানে ৮০% পর্যন্ত বেড়ে গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা এলাকাটিকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ