ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলা আজ এক উৎসবমুখর দিন পার করল। উপজেলার স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ খায়রুল্লাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বসেছিল এক অন্যরকম আয়োজন। মূলত সেইসব ছাত্রীদের সম্মান জানাতেই এই আয়োজন, যারা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং ২০২৫ সালের জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। সকাল থেকেই স্কুলের চারদিকের পরিবেশটা ছিল একেবারে সাজ সাজ রব। নতুন ড্রেস আর গলায় মেডেল পরা শিক্ষার্থীদের হাসিমুখগুলো বলে দিচ্ছিল তাদের সাফল্যের অসামান্য গল্প।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় এই স্কুলটি গফরগাঁও উপজেলার মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরেছে। ৪২ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়ে স্কুলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ গ্রেড মিলিয়ে মোট ২২ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। অর্থাৎ এই স্কুলের ছাত্রীদের মেধার বিচারে সাফল্যের হার প্রায় ৯৮% ছাড়িয়ে গেছে। উপজেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করাটা কেবল স্কুলের শিক্ষকদের কৃতিত্ব নয়, বরং এর পেছনে ছাত্রীদের নিরলস অধ্যাবসায় এবং শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা ছিল মূল চাবিকাঠি। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রতিটি বক্তৃতায় এই সাফল্যের কথা বারবার উঠে আসছিল।
গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ ইউসুফ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে এক উদ্দীপনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি একে একে মেধাবী ছাত্রীদের হাতে উজ্জ্বল সোনালী রঙের সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজকের এই মেয়েরাই আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়বে। শিক্ষা খাতে বর্তমান সরকারের বিনিয়োগ আগের চেয়ে প্রায় ১৫% বেড়েছে এবং প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অর্থ শিক্ষার মান উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে। ইউএনও ছাত্রীদের কেবল ভালো রেজাল্ট নয়, বরং আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, এই মেধা কেবল পরীক্ষার খাতায় নয়, বরং বাস্তবে দেশের উন্নয়নমূলক কাজে লাগাতে হবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ মোস্তফা কামাল অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, গফরগাঁওয়ের শিক্ষার পরিবেশ দিন দিন উন্নত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের এমন অভাবনীয় সাফল্য দেখে তিনি সত্যি মুগ্ধ। তিনি জানান, সরকারি বৃত্তির টাকা এখন সরাসরি শিক্ষার্থীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পৌঁছে যাচ্ছে, যার ফলে এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে ১০০%। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রওশন আরা খান। তিনি বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ছাত্রীদের এই সাফল্য তার দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এই রেজাল্ট স্কুলের সুনাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হাসিনা মমতাজ, মোঃ নুরুজ্জামান এবং মোঃ মিজানুর রহমানও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক কথা বলেন। তারা মনে করেন, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সমন্বিত প্রচেষ্টাই এই ভালো রেজাল্টের আসল কারণ। স্কুলের বর্তমান পরিবেশ এবং পড়ালেখার মান যাচাই করলে দেখা যায়, গত ৫ বছরে পাশের হার আগের তুলনায় অন্তত ১০% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে এই স্কুলটি ময়মনসিংহ জেলা ছাড়িয়ে পুরো বিভাগে সেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এবং বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক কবীর আহমেদ তার প্রাণবন্ত উপস্থাপনার মাধ্যমে পুরো অনুষ্ঠানটি মাতিয়ে রাখেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অংশে ছিল ছাত্রীদের অংশগ্রহণে এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কৃতি ছাত্রীরা পড়াশোনার পাশাপাশি যে নাচ, গান এবং আবৃত্তিতেও সমান পটু, তা তারা মঞ্চে প্রমাণ করে দেখাল। পুরো অডিটোরিয়াম তখন দর্শকদের করতালিতে মুখর ছিল। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের এমন রাজকীয় সম্মাননা পেতে দেখে খুশিতে আত্মহারা ছিলেন। তাদের চোখেমুখে ছিল বড় হওয়ার স্বপ্ন আর তৃপ্তির হাসি। সংবর্ধনা পাওয়া একজন ছাত্রী জানায়, এই ক্রেস্ট তাকে ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেক বেশি অনুপ্রেরণা যোগাবে। এমন সম্মাননা শিক্ষার্থীদের মানসিক শক্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
বর্তমান সময়ে শিক্ষা খাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিনিয়োগের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া স্কলারশিপের পরিমাণ গত বছরের চেয়ে প্রায় ২০% বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী কয়েক হাজার ডলারের সরকারি বৃত্তি নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন। গফরগাঁওয়ের এই স্কুলের কৃতি ছাত্রীরাও ভবিষ্যতে সেই সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে বিদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার স্বপ্ন দেখছে। সংবর্ধনা শেষে অতিথিরা ছাত্রীদের সাথে দলগত ছবি তোলেন এবং সকলকে মিষ্টি মুখ করানো হয়।
সব মিলিয়ে ২০ আগস্টের এই দিনটি গফরগাঁওয়ের ইতিহাসে এবং খায়রুল্লাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ডায়েরিতে এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে থাকবে। কৃতি ছাত্রীদের এই সংবর্ধনা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাফল্যের এই আনন্দ যেন প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় এবং প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন নিজের সেরাটা দিতে উদ্বুদ্ধ হয়, এমন প্রত্যাশা নিয়েই শেষ হয় আজকের এই উৎসব। বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক রওশন আরা খান উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
















