চিনির লোকসান ছাপিয়ে কেরুজের বাজিমাত: এক বছরে রেকর্ড ১৬৫ কোটি টাকা মুনাফা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় অবস্থিত দেশের একমাত্র লাভজনক রাষ্ট্রীয় চিনিকল ‘কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড’ সাফল্যের নতুন রেকর্ড গড়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও চিনি উৎপাদন করতে গিয়ে কোম্পানিটিকে লোকসান গুনতে হয়েছে, কিন্তু অন্য ৫টি বিভাগের অভাবনীয় সাফল্যে সেই ক্ষতি কাটিয়ে বিশাল মুনাফা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেরুজ কমপ্লেক্স সব মিলিয়ে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা এই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড। আজ শুক্রবার মিল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ডিস্টিলারি বা মদ উৎপাদনকারী বিভাগ।

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির এই বিশাল আয়ের সুফল সরাসরি ভোগ করছে রাষ্ট্র। মুনাফার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি সরকারের রাজস্ব খাতে মোটা অঙ্কের অর্থ জমা দিয়েছে। গত এক বছরে ১৫৩ কোটি টাকা ভ্যাট ও আয়কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে এই শিল্প প্রতিষ্ঠান। চিনিকলটি কেবল নিজের লোকসানই মেটায়নি, বরং দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রেখে চলেছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে মোট মুনাফা ছিল ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২৭%। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় এবার লাভ বেশি হয়েছে ৩৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকারও বেশি।

কেরুজের ব্যবসায়িক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর ছয়টি বিভাগের মধ্যে পাঁচটিই লাভের মুখ দেখেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা এসেছে ডিস্টিলারি বিভাগ থেকে। এই বিভাগটি একাই ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা মুনাফা করেছে। গত অর্থবছরে এখানে ২ লাখ ৮ হাজার ৮৬২ কেস ফরেন লিকার বা বিদেশি মদ উৎপাদন করা হয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই বিক্রি হয়ে গেছে। এছাড়া ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৮১০ কেস বাংলা মদ উৎপাদন ও বিক্রি করে কোম্পানিটি বড় অংকের টাকা আয় করেছে। ডিস্টিলারি বিভাগের এই বিশাল লাভ না থাকলে চিনিকলটির টিকে থাকা কঠিন হতো।

অন্যদিকে, চিনি বিভাগের চিত্র বরাবরের মতোই কিছুটা হতাশাজনক। পুরনো যন্ত্রপাতি আর আখের স্বল্পতার কারণে চিনি উৎপাদনে এবারও ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, গত বছরের তুলনায় লোকসানের পরিমাণ এবার কিছুটা কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চিনি বিভাগে লোকসান ছিল ৬২ কোটি ১৮ লাখ টাকা। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চিনিকলটি আধুনিকায়ন করা গেলে এবং আখের ফলন বাড়ানো সম্ভব হলে এই লোকসান শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে চিনির উৎপাদন খরচ বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় এই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

কেরুজের অধীনে থাকা ৯টি বাণিজ্যিক খামার ও কৃষি বিভাগও এবার ভালো করেছে। ৯টি খামার থেকে ৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং আকন্দবাড়িয়া পরীক্ষামূলক খামার থেকে ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা লাভ এসেছে। এছাড়া অর্গানিক বা জৈব সার তৈরির কারখানা (বায়োফার্টিলাইজার) থেকে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা মুনাফা অর্জিত হয়েছে। এমনকি ছোট ডিস্টিলারি ফার্মাসিউটিক্যাল বিভাগ থেকেও প্রায় ৪ লাখ টাকা আয় হয়েছে। এই ছোট ছোট বিভাগগুলোর সম্মিলিত সাফল্যই কেরুজকে একটি শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

আখ চাষ ও মাড়াইয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৫ হাজার ৫৬২ একর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছিল। এর মধ্যে সাধারণ কৃষকদের জমি ছিল প্রায় ৭০% এবং বাকি ৩০% ছিল মিলের নিজস্ব জমি। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৬ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৪ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করা। কিন্তু পুরনো কারখানায় যান্ত্রিক ত্রুটির আশঙ্কায় মাড়াই কার্যক্রম নির্ধারিত ৬৯ দিনের পরিবর্তে ৫৯ দিনেই শেষ করতে হয়। ফলে চিনি উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০% কম। তবে চিনি আহরণের হার ৫.৯০% পর্যন্ত থাকায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে।

চিনিকল এলাকায় দৈনিক গড় আখ মাড়াই হয়েছে ১ হাজার ৪২ মেট্রিক টন, যেখানে লক্ষ্য ছিল ১ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন। মূলত আখের অভাবে মিলটি পূর্ণ সময় চালানো সম্ভব হয়নি। কৃষকদের আখের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ উৎসাহিত করতে পারলে আখের সরবরাহ আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে চিনিকলটির চিনি বিভাগকে লাভজনক করতে হলে ডিস্টিলারি বিভাগের মতো এখানেও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।

দর্শনার এই চিনিকলটি চুয়াডাঙ্গা জেলার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। হাজার হাজার শ্রমিক ও কৃষকের রুটি-রুজি এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। চিনির লোকসান সত্ত্বেও ১৬৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা করা একটি বড় কৃতিত্বের বিষয়। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, আগামী বছরগুলোতে মুনাফার এই ধারা বজায় থাকবে এবং চিনির লোকসান আরও কমিয়ে আনা যাবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মতো অন্যান্য সরকারি চিনিকলগুলোকেও যদি এভাবে বহুমুখী আয়ের পথে নেওয়া যায়, তবে চিনি শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ