মাদকের বিষদাঁত ভাঙতে চুয়াডাঙ্গায় বিশাল জনসভা: ‘পরিবার বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই’

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার সীমান্তবর্তী গ্রাম আকন্দবাড়ীয়ায় গত বৃহস্পতিবার এক বিশাল মাদকবিরোধী র‍্যালি ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচি পুরো এলাকায় এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছে। সন্ধ্যার পর যখন চারদিকে অন্ধকার নেমে আসছিল, তখন শত শত মানুষের হাতের মশাল আর ব্যানারের স্লোগান মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এক কঠিন হুঁশিয়ারি পৌঁছে দেয়। দর্শনা থানা লোকমোর্চা ও আকন্দবাড়ীয়া মাদক নির্মূল কমিটি এই আয়োজনের মূল দায়িত্বে ছিল। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেন চুয়াডাঙ্গার জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান।

২০ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ আকন্দবাড়ীয়া এলাকায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। ‘মাদকের আগ্রাসন দৃশ্যমান, প্রতিরোধেই সমাধান’ এবং ‘পরিবার, সমাজ ও দেশ বাঁচাতে, মাদক রুখতে হবে একসাথে’ এই শক্তিশালী প্রতিপাদ্যগুলোকে সামনে রেখে র‍্যালিটি শুরু হয়। গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে যখন মিছিলটি এগোচ্ছিল, তখন স্থানীয় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাতে যোগ দেন। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৬০% ছিল তরুণ সমাজ, যারা আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার কারিগর। র‍্যালিতে নারী ও শিশুদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো, যা প্রমাণ করে মাদকের বিরুদ্ধে ঘরের গৃহিণীরাও এখন কতটা সোচ্চার।

পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান অত্যন্ত সহজ ভাষায় মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মাদক কেবল একজন মানুষকে মারে না, বরং একটি সাজানো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে সংঘটিত অপরাধগুলোর মধ্যে প্রায় ৭০% কোনো না কোনোভাবে মাদকের সাথে জড়িত। মাদকসেবীরা তাদের নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ছিনতাই, চুরি এমনকি খুনের মতো জঘন্য কাজ করতেও দ্বিধা করে না। এসপি রুহুল কবীর আরও জানান, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় মাদক পাচারের ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই পুলিশ একা পাহারা দিয়ে এটি পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না, যদি না সাধারণ মানুষ তথ্য দিয়ে সহায়তা করে।

মাদকের অর্থনৈতিক ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কোনো সদস্য মাদকাসক্ত হলে সেই পরিবারের মাসিক আয়ের অন্তত ২৫% থেকে ৩০% কেবল নেশার পেছনেই খরচ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয় হাজার হাজার ডলার। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে যদি এই বিশাল পরিমাণ অর্থ মাদকের পেছনে নষ্ট হয়, তবে জাতীয় অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির পেছনে মাসে গড়ে অন্তত ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা খরচ হয়, যা দিয়ে একটি ছোট পরিবারের পুরো মাসের খরচ চালানো সম্ভব। এই অপচয় রোধ করতে না পারলে সমাজের উন্নয়ন থমকে যাবে।

আকন্দবাড়ীয়া মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যরা সভায় প্রতিজ্ঞা করেন যে, তারা তাদের গ্রামকে ১০০% মাদকমুক্ত ঘোষণা না করা পর্যন্ত থামবেন না। তারা জানান, গ্রামে এখন থেকে রাতে পাহারা বসানো হবে এবং কোনো বহিরাগত সন্দেহভাজন ব্যক্তি এলাকায় ঢুকলে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হবে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন যে, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার সুযোগ নিয়ে কিছু কুচক্রী মহল এই অঞ্চলে ফেনসিডিল ও ইয়াবার বিস্তার ঘটাচ্ছে। পুলিশ সুপার এসব অসাধু ব্যক্তিদের হুঁশিয়ার করে বলেন, যারা টাকার লোভে যুবসমাজকে ধ্বংস করছে, তাদের জায়গা হবে জেলখানায়। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ এবার আর নেই।

অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তারা পারিবারিক সচেতনতার ওপর জোর দেন। তারা বলেন, বাড়ির ছেলেমেয়েরা কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে সেদিকে বাবা-মাকে অন্তত ৮০% সময় নজর দিতে হবে। সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুললে তারা বিপথে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহে অন্তত একদিন মাদকের কুফল নিয়ে আলোচনার জন্য শিক্ষকদের অনুরোধ জানানো হয়। কারণ ৯৫% মাদকাসক্ত ব্যক্তিই তাদের কৈশোর বা প্রথম যৌবনে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে প্রথম নেশা শুরু করে। এই সময়টাতেই তাদের সঠিক পথ দেখানো জরুরি।

দর্শনা থানা লোকমোর্চার প্রতিনিধিরা বলেন, সামাজিক আন্দোলন ছাড়া মাদক নির্মূল করা অসম্ভব। তারা প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় মাদকবিরোধী ছোট ছোট কমিটি গঠন করার প্রস্তাব দেন। এই কমিটিগুলো স্থানীয় পুলিশের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখবে। তথ্য দাতার নাম সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে বলেও আশ্বাস দেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, আপনার দেওয়া একটি ছোট তথ্য একটি জীবন এবং একটি পরিবারকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। সভায় আগত সর্বস্তরের মানুষ হাত তুলে শপথ নেন যে, তারা মাদককে ‘না’ বলবেন এবং মাদক কারবারিদের সামাজিকভাবে বয়কট করবেন।

পরিশেষে, রাত প্রায় ৯টার দিকে মোনাজাত ও শপথের মধ্য দিয়ে এই মাদকবিরোধী পথসভা শেষ হয়। দর্শনা থানার এই উদ্যোগ এখন পুরো চুয়াডাঙ্গা জেলার জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে এখন আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে যে, সবাই মিলে রুখে দাঁড়ালে মাদকের এই অন্ধকার থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব। তবে র‍্যালি বা পথসভাতেই যেন এই আন্দোলন থেমে না যায়, সেজন্য নিয়মিত তদারকি ও সচেতনতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন উপস্থিত সচেতন নাগরিকরা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ