ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে পর্নোগ্রাফি মামলার আসামি, মাদক সেবনকারী এবং ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতকসহ মোট ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ২১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লার নেতৃত্বে থানা পুলিশের পৃথক পৃথক দল উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এই অভিযান পরিচালনা করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে পর্নোগ্রাফি আদান-প্রদান করে ভিকটিমকে ব্ল্যাকমেইল করা এবং প্রকাশ্য স্থানে মাদক সেবনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িতরা রয়েছেন। পুলিশ জানায়, সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করতে তাদের এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে।
অভিযানের শুরুতেই পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে বড় ধরনের সাফল্য পায় শৈলকুপা থানা পুলিশ। শৈলকুপা থানার মামলা নং- ২৩(৮)২৬ এর এজাহারনামীয় দুই আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার চন্ডিখালি পশ্চিমপাড়ার মোঃ শহিদুল মোল্লার ছেলে সোহানুর রহমান (২৬) এবং একই এলাকার মৃত আরজুল শেখের ছেলে লালচাঁদ (২৬)। পুলিশ জানায়, এই দুই যুবক পর্নোগ্রাফি তৈরি করে তা অনলাইনে বিভিন্ন মাধ্যমে আদান-প্রদান করত। শুধু তাই নয়, ইন্টারনেটে এসব ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তারা ভিকটিমকে দীর্ঘ দিন ধরে মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তাদের অবস্থান শনাক্ত করে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এই ধরনের ডিজিটাল অপরাধ দমনে পুলিশ বর্তমানে ১০০% তৎপরতা দেখাচ্ছে।
মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে পুলিশ ফাজিলপুর ও কাজীপাড়া এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় মাদক সেবনরত অবস্থায় মোঃ মিরুজ (৩০) নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি শৈলকুপার ফাজিলপুর গ্রামের শাহাদাৎ শেখের ছেলে। পুলিশ তাকে হাতেনাতে ধরে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারায় বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করে। আদালত মামলার শুনানি শেষে আসামি মিরুজকে ৩ মাসের কারাদণ্ড এবং ২,০০০ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে আরও ১৫ দিন জেল খাটতে হবে। মাদকাসক্তদের কারণে গ্রামীণ জনপদে অপরাধের হার প্রায় ২০% থেকে ৩০% বেড়ে যায় বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। তাই পুলিশের এই পদক্ষেপকে সাধারণ মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছে।
একই দিন অপর এক অভিযানে কাজীপাড়া এলাকা থেকে মাদক সেবনকারী মোঃ হাফিজুর রহমান হিটুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি ওই এলাকার মৃত আজিজের ছেলে। হিটুর বিরুদ্ধেও মাদক সেবনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তাকেও ২০১৮ সালের মাদক আইনের ৩৬(৫) ধারায় আদালতে তোলা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাকে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২,০০০ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা অনাদায়ে তাকেও অতিরিক্ত ১৫ দিন কারাগারে থাকতে হবে। পুলিশ বলছে, মাদক ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সেবনকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে যাতে সমাজে মাদকের চাহিদা ৫০% কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।
ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামিদের ধরতে পুলিশ বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে। আদালতের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দীর্ঘ দিন পলাতক থাকা চারজন আসামিকে এদিন গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন কাজীপাড়া গ্রামের মৃত তোয়াজ শেখের ছেলে মোঃ মাসুদ শেখ ও মৃত আজিজের ছেলে মোঃ হাফিজুর রহমান হিটু (যিনি মাদক মামলায়ও দণ্ডিত), ভবানিপুর গ্রামের আলম মন্ডলের ছেলে রিয়াদ এবং চর ভবানিপুর গ্রামের মাসুদ বিশ্বাসের ছেলে সেজান। এই আসামিরা দীর্ঘ দিন ধরে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিল। পুলিশের একটি চৌকস দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাদের নিজ নিজ এলাকা থেকে আটক করতে সক্ষম হয়।
এছাড়া পুলিশের নিয়মিত টহলের সময় সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে হিতামপুর গ্রামের আমানত শেখের ছেলে মোঃ সাইফুল ইসলামকে (৪৮) গ্রেফতার করা হয়। তাকে পুলিশ আইনের ৩৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতে পাঠানো হয়েছে। শৈলকুপা থানা সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় ছোটখাটো অপরাধ দমনে এই ধারাটি বেশ কার্যকর। বিশেষ করে ভবঘুরে বা রাতে অকারণে ঘোরাঘুরি করা ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে এই আইনে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ জানায়, গত কয়েক মাসে শৈলকুপা এলাকায় অপরাধ প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা সংবাদমাধ্যমকে জানান, এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা আমাদের প্রধান কাজ। পর্নোগ্রাফি বা অনলাইনে হয়রানি বর্তমান সময়ে একটি বড় সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এসব অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেব না। পাশাপাশি মাদক ও পলাতক আসামিদের ধরতে আমাদের অভিযান প্রতিদিন চলবে। আমরা চাই শৈলকুপার সাধারণ মানুষ যেন নির্ভয়ে চলাচল করতে পারে। তিনি সাধারণ নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান, কোথাও কোনো অপরাধ হতে দেখলে বা মাদক কেনাবেচার খবর পেলে যেন তাৎক্ষণিক পুলিশকে জানানো হয়।
শৈলকুপা থানা পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযানের ফলে অপরাধীদের মধ্যে বর্তমানে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, নিয়মিত এই ধরনের অভিযান চললে চুরি, ছিনতাই এবং মাদকের প্রকোপ অনেকাংশে কমে আসবে। গ্রেফতারকৃত সকল আসামিকে প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্রসহ ঝিনাইদহ বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হলো। পুলিশের এই সাফল্যে এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ীরাও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, কারণ এর ফলে বাজারে চাঁদাবাজি ও বখাটেদের উৎপাত অনেকটাই কমে গেছে।
















