এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দেশের সর্বোচ্চ এই সাংবিধানিক পদে তাকে শপথবাক্য পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। শপথ গ্রহণের পর বর্তমান সংসদের ৩৪৯ জন সদস্যের মধ্যে উপস্থিত অধিকাংশ সদস্য এবং দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাকে করতালির মাধ্যমে অভিনন্দন জানান। মির্জা ফখরুলের এই শপথ নেওয়ার মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে বঙ্গভবনে ছিল উৎসবের আমেজ। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন, যিনি তার নতুন রাষ্ট্রপতির সাথে উষ্ণ করমর্দন করেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে বিদেশি কূটনীতিক ও সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এবং ঠিক সময়মতো পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মূল কার্যক্রম শুরু হয়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই রাষ্ট্রপতি হওয়া মোটেও সহজ ছিল না। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এক দীর্ঘ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি জয়ী হন। প্রায় ৩৫ বছর পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখল দেশ। নির্বাচনে মোট ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পান ২৫৫ ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৭৪.৩%। অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান মাত্র ৮৮ ভোট। বিপুল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর আজ তিনি দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ৭৮ বছর বয়সী এই নেতা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। সর্বশেষ তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে সফলভাবে কাজ করেছেন। ওই মন্ত্রণালয়ে থাকার সময় তিনি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ২৫ শতাংশ বাজেটের তদারকি করতেন, যার পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। রাজনৈতিক জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। ২০১৬ সাল থেকে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা এই রাজনীতিবিদ দলের চরম দুঃসময়ে হাল ধরেছিলেন। প্রায় ১০ বছর ভারপ্রাপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে কাজ করার পর এখন তিনি দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে গিয়ে রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবেন।
মির্জা ফখরুল ইসলামের রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবন অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করার পাশাপাশি তিনি সরকারি চাকরিতে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে পাকিস্তানি জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি সংগঠক হিসেবে বিশাল ভূমিকা রাখেন, যা তাকে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৯৮৬ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সরাসরি রাজনীতিতে পা রাখেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর নব্বইয়ের দশকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনি দলের একজন অপরিহার্য নেতায় পরিণত হন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব পান। পর্যটন খাতের উন্নয়নে তিনি তখন বার্ষিক বাজেটে প্রায় ১০ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিলেন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা এখন তাকে দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দিকনির্দেশনা দিতে সাহায্য করবে।
শপথ অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল যখন সংবিধান রক্ষার শপথ নিচ্ছিলেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, কোনো অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে তিনি সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী আচরণ করবেন। শপথের পর তিনি শপথনামায় স্বাক্ষর করেন এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার তা সত্যায়ন করেন। বিদায়ী রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান। রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখন থেকে তিনি বঙ্গভবনের বাসিন্দা হবেন এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেবেন। বিশেষ করে জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান এবং সরকারের বিভিন্ন সাংবিধানিক নিয়োগের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা থাকবে মুখ্য।
নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করা। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সকলের সাথে মিলেমিশে কাজ করার ক্ষমতা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, তিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে কাজ করবেন। শপথ শেষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেশের স্থিতিশীল রাজনীতির এক নতুন বার্তা দিচ্ছে।
















