নরসিংদীর মাধবদীতে স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর মরদেহ গুম করার এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় ঘাতক স্বামী শরীফ মিয়াকে (৪২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে মাধবদী থানা পুলিশ। নিহত গৃহবধূর নাম জাহানারা বেগম (৩৯)। পুলিশ জানিয়েছে, স্ত্রীকে হত্যার পর বাড়ির আঙিনাতেই মরদেহ মাটিচাপা দিয়ে গুম করার চেষ্টা করেছিলেন শরীফ। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, পুলিশের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কাছে ধরা দিতেই হয়েছে এই পাষণ্ড স্বামীকে।
নিহত জাহানারার স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর আগে পারিবারিকভাবে শরীফ মিয়ার সঙ্গে জাহানারার বিয়ে হয়। দীর্ঘ দেড় দশকের এই সংসারে তাদের ৮ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। শরীফ পেশায় একজন হোটেল শ্রমিক এবং তিনি মাধবদী শহরের একটি খাবার হোটেলে কাজ করতেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের সংসারে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কলহ চললেও সেটি যে এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নেবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। নিহতের পরিবার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত শরীফের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত শরীফ মিয়া হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি পুলিশকে জানান, গত সোমবার বিকেলে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর প্রচণ্ড কথা কাটাকাটি হয়। ঝগড়ার একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে তিনি জাহানারার মুখে জোরে একটি থাপ্পড় মারেন। এতে জাহানারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উঠানে থাকা টিউবওয়েলের ওপর পড়ে যান এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কিছুক্ষণ পর শরীফ তাঁকে উদ্ধার করে ঘরের ভেতরে নিয়ে যান। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পার হলেও জাহানারার জ্ঞান ফেরেনি। একপর্যায়ে শরীফ বুঝতে পারেন যে তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন।
স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শরীফ। ঘটনা জানাজানি হলে পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যাবে এই ভয়ে তিনি কাউকেই কিছু জানাননি। লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘরের পাশেই একটি গর্ত করে তিনি স্ত্রীর মরদেহ মাটিচাপা দিয়ে দেন। ঘটনাটিকে সাধারণ নিখোঁজ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি বুধবার দুপুরে নিজেই থানায় হাজির হন। সেখানে গিয়ে তিনি নাটক সাজানোর চেষ্টা করেন যে, তাঁর স্ত্রী দুই দিন ধরে নিখোঁজ এবং কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
শরীফের এই অতি-সতর্ক আচরণ এবং অসংলগ্ন কথাবার্তা শুরুতেই পুলিশের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানান, “শরীফ যখন থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করতে আসেন, তখন তাঁর চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ ছিল। তাঁর দেওয়া তথ্যের মধ্যে ১০০% অমিল পাওয়া যাচ্ছিল। তখনই আমরা স্থানীয় লোকজনকে তাঁর ওপর নজর রাখতে বলি এবং তাঁকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করি। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি ভেঙে পড়েন এবং স্ত্রীকে হত্যার পর মাটিচাপা দেওয়ার কথা স্বীকার করেন।”
হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি সুখী পরিবারের এমন করুণ পরিণতি দেখে স্থানীয়রা হতবাক। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেহেতু মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, তাই এটি উত্তোলনের জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতির প্রয়োজন। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর বোঝা যাবে জাহানারার মৃত্যু কেবল আঘাতের কারণেই হয়েছে নাকি অন্য কোনোভাবে তাঁকে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল।
বর্তমানে ঘাতক স্বামী শরীফ মিয়া পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। পুলিশ এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নরসিংদীর সাধারণ মানুষ এই নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। মাত্র কয়েক মিনিটের রাগের মাথায় ১৫ বছরের জীবনসঙ্গীকে হত্যা করে ৮ বছরের শিশুকে মাতৃহারা করার এই ঘটনা সবাইকে নাড়া দিয়ে গেছে। পুলিশ বলছে, অপরাধী যত কৌশলীই হোক না কেন, আইনের হাত থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ নেই।
















