স্বাধীনতার মহানায়ক বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৫৫তম শাহাদাত বার্ষিকী আজ: নরসিংদীতে বিনম্র শ্রদ্ধা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

আজ ২০ আগস্ট। আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মাত্র ২৯ বছর বয়সে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। দেশের আকাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পাকিস্তানি দখলদারদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, আজ তাঁর ৫৫তম শাহাদাত বার্ষিকীতে জাতি তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে। বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে তিনি অন্যতম, যাঁর সাহসিকতা ১০০% দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালনের জন্য বীরশ্রেষ্ঠের পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিনভর বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নেওয়া হয়েছে। রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা জানান, সকাল থেকেই প্রশাসনের কর্মকর্তারা বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ম্যূরালে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এরপর স্থানীয় মিলনায়তনে তাঁর জীবন ও বীরত্ব নিয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সবশেষে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনায় এক বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর। পুরান ঢাকার ১০৯ নম্বর আগা সাদেক রোডের ‘মোবারক লজ’ ছিল তাঁর জন্মস্থান। তবে তাঁর শেকড় বা পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামে, যা আজ তাঁর নামানুসারে ‘মতিউরনগর’ হিসেবে পরিচিত। পরিবারের মোট ১১ জন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ। তাঁর বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ ও মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন তাঁকে ছোটবেলা থেকেই সাহসী ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে তোলেন। ৯ জন ভাই ও ২ জন বোনের বিশাল পরিবারে তিনি ছিলেন সবার প্রিয়।

মতিউর রহমান ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়ে নিজের পেশাদার জীবন শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রম ও মেধার জোরে ১৯৬৩ সালে তিনি রিসালপুর পিএএফ কলেজ থেকে পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন। এরপর করাচির মৌরিপুর (বর্তমানে মাসরুর) বিমান ঘাঁটির ২ নম্বর স্কোয়ার্ডনে জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসেবে তাঁর নিয়োগ হয়। আকাশজয়ের নেশায় মত্ত এই বীর ১৯৬৭ সালে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি পান। তাঁর উড্ডয়ন দক্ষতা ও সাহসিকতা পাকিস্তান বিমান বাহিনীতেও বেশ প্রশংসিত ছিল।

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে যুদ্ধ শুরু হয়, মতিউর রহমান তখন করাচিতে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু দেশের টানে তিনি স্থির থাকতে পারেননি। ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি ছুটি নিয়ে ঢাকা আসেন এবং ৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান। তবে তাঁর লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন যে একটি জঙ্গি বিমান কবজা করবেন এবং সেটি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবেন। সেই সময় পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে তাঁকে বিমানের সেফটি অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হয়।

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট ছিল মতিউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক দিন। তিনি পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ বছর বয়সী রাশেদ মিনহাজ নামে একজন শিক্ষানবীশ পাইলটের উড্ডয়নের সময়কে লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন। রাশেদ যখন ব্লু-বার্ড ১৬০ নামের টি-৩৩ বিমানটি নিয়ে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন মতিউর রহমান কৌশলে বিমানে উঠে পড়েন। তিনি চেয়েছিলেন বিমানটি নিয়ে ভারতে চলে আসতে এবং মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর শক্তি বাড়াতে। কিন্তু মাঝ আকাশে রাশেদ মিনহাজ ও পাকিস্তানের অন্যান্য জঙ্গি বিমানের বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁকে।

আকাশে চলে দুই পাইলটের মধ্যে জীবন-মরণ লড়াই। মতিউর রহমান বিমানটি নিয়ে ভারতীয় সীমান্তের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। বিমানটি তখন ভূপৃষ্ঠ থেকে খুব কম উচ্চতায় উড়ছিল। ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে সিন্ধু প্রদেশের থাট্টা এলাকায় একসময় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। দুর্ভাগ্যবশত মতিউর রহমানের সাথে কোনো প্যারাসুট ছিল না, ফলে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। দেশের জন্য আকাশপথে এই অসম সাহসী লড়াই তাঁকে বীরত্বের সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে গেছে।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০০৬ সালে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এখন তিনি মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। তাঁর এই অসামান্য ত্যাগ বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। রায়পুরা তথা নরসিংদীবাসী আজ গর্বের সাথে পালন করছে তাঁদের এই প্রিয় সন্তানের শাহাদাত বার্ষিকী। তাঁর জীবনী নতুন প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ