বিদায়ী বক্তব্যে বারবার কাঁদলেন মির্জা ফখরুল, ঐক্যের শক্ত বার্তা দিলেন তারেক রহমান

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে আজ এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বিদায়ী বক্তব্য দিতে গিয়ে বারবার চোখের পানি মুছলেন দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রাম আর সহকর্মীদের ভালোবাসার কথা স্মরণ করে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রায় ৯০ মিনিটের এই বৈঠকে উপস্থিত সংসদ সদস্যরাও ফখরুলের কান্না দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। সভার সভাপতিত্ব করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি মির্জা ফখরুলকে একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে উল্লেখ করে আগামীকালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে ১০০% ভোট দিয়ে বিজয়ী করার নির্দেশ দেন।

সভার শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি উপস্থিত সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট দেওয়ার বিস্তারিত নিয়মকানুন বুঝিয়ে বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও একজন ভোটার হিসেবে ভোট দেবেন। যদি তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তবে তার ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য হয়ে যাবে। এই ১টি আসনের শূন্যতা পূরণ করা সহজ হলেও মির্জা ফখরুলের মতো অভিভাবকের অভাব পূরণ করা কঠিন বলে অনেক সংসদ সদস্য মন্তব্য করেন। চিফ হুইপ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দলের প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।

এরপর বক্তব্য দিতে দাঁড়ান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঞ্চে দাঁড়ানোর পর থেকেই তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বিএনপির কারাবন্দী ও অসুস্থ চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “ম্যাডাম আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, আমি তা পালন করতে গিয়ে কতটুকু সফল হয়েছি জানি না। তবে আমার ওপর দল যে ৯৯% আস্থা রেখেছে, আমি তা জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।” দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তিনি সবার কাছে ক্ষমা চান। বক্তব্যে তিনি ৪ থেকে ৫ বার কান্নায় ভেঙে পড়েন, যা পুরো সভায় এক স্তব্ধতা নামিয়ে আনে।

মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বঙ্গভবনে যাওয়ার পর তিনি তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীদের অনেক মিস করবেন। দলের দুঃসময়ে রাজপথে যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন, তাদের কথা তিনি কখনো ভুলবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি ১% হলেও আপস করবেন না বলে দৃঢ় অঙ্গীকার করেন। তিনি সংসদ সদস্যদের কাছে দোয়া চান এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রের অভিভাবকের দায়িত্ব পালনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

পরবর্তীতে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি এই দিনটিকে ঐতিহাসিক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “আমরা অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে আজ এই পর্যায়ে এসেছি। আমাদের এই অর্জন ধরে রাখতে হবে।” তারেক রহমান মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, দলের ক্রান্তিকালে তিনি যেভাবে হাল ধরেছিলেন, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি দলের সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দেন যাতে তারা আগামীকালকের নির্বাচনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে মির্জা ফখরুলের পক্ষে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নির্বাচনে দলের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।

সভার এক পর্যায়ে তারেক রহমান আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, দলের অনেক সংসদ সদস্যের সাথে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ১০% থেকে ১৫% এলাকায় এই দূরত্ব প্রকট। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া হচ্ছে, তাই এটি আমাদের জন্য ১০০% চ্যালেঞ্জিং। গত সংসদ নির্বাচনে অনেকে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় দলের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এবার যদি কেউ দল সমর্থিত প্রার্থীর বিরোধিতা করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তারেক রহমান স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের প্রার্থী করার ওপর জোর দেন। তিনি সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা অন্তত ৮০% এর ওপরে, তাদেরই যেন প্রাধান্য দেওয়া হয়। সংসদ সদস্যদের এলাকাভিত্তিক কোন্দল মেটানোর জন্য তিনি ৩ দিনের আল্টিমেটাম দেন। তিনি মনে করেন, তৃণমূল শক্তিশালী না হলে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনবিচ্ছিন্ন না হওয়ার জন্য তিনি প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশ দেন।

বৈঠক শেষে উপস্থিত নেতারা জানান, আজকের সভায় যেমন আবেগ ছিল, তেমনি ছিল সাংগঠনিক কঠোরতা। সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সবাই একমত হয়েছেন যে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হলে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে। সভা শেষে সংসদ সদস্যরা হাসিমুখে বের হলেও মির্জা ফখরুলের বিদায়ী কান্নার রেশ সবার মনেই এক ধরণের বিষণ্ণতা রেখে গেছে। এখন সবার নজর আগামীকালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিকে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ