নড়াইলে শিশু জান্নাতুল মাওয়া হত্যা মামলার রায়: ঘাতক রবির ফাঁসির আদেশ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি:

নড়াইলের সদর উপজেলায় ৫ বছরের অবুঝ শিশু জান্নাতুল মাওয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অবশেষে ন্যায়বিচার পেয়েছে তার পরিবার। চাঞ্চল্যকর এই মামলার একমাত্র আসামি প্রতিবেশী রবিউল শিকদার রবিকে (৩৫) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নড়াইলের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ ছামিদুল ইসলাম জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে নড়াইলবাসী প্রমাণ পেল যে, অপরাধী যেই হোক না কেন, আইনের হাত থেকে পালানো সম্ভব নয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, বিচারক শুধু ফাঁসির আদেশই দেননি, বরং আসামিকে ৩ লক্ষ টাকা জরিমানাও করেছেন। বাংলাদেশী মুদ্রায় এই জরিমানার পরিমাণ অনেক হলেও এটি নিহতের পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির তুলনায় সামান্য। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এই জরিমানার অংক প্রায় ২,৫০০$ ডলারের কাছাকাছি। নড়াইল জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) তারিকুজ্জামান লিটু জানিয়েছেন, মামলার সব তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে আদালত এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে থাকা সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি নেমে আসে।

এই নিষ্ঠুর ঘটনার শুরু হয়েছিল গত ২০ জুলাই বিকেলে। রামচন্দ্রপুর গ্রামে বাড়ির পাশে খেলা করার সময় ঘাতক রবিউল জান্নাতুল মাওয়াকে একা পেয়ে যায়। লম্পট রবিউল শিশুটিকে ফুসলিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালায় এবং পরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পেশায় রাজমিস্ত্রি এই পাষণ্ড জানত না যে, তার এই পাপের হিসাব খুব দ্রুতই দিতে হবে। পরদিন সকালে শিশুটির বাবা বাদী হয়ে নড়াইল সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশ ও স্থানীয় জনতার তৎপরতায় ওই দিনই সকাল ৯টার দিকে দত্তপাড়া এলাকা থেকে রবিউলকে আটক করা হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়েছে। মামলার তদন্ত শেষ করে মাত্র ১৫ দিনের মাথায় অর্থাৎ ৪ আগস্ট নড়াইল সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অজয় কুমার কুণ্ডু আদালতে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেন। সাধারণত বাংলাদেশে এমন মামলার ক্ষেত্রে চার্জশিট দিতে আরও বেশি সময় লাগে, কিন্তু এই ক্ষেত্রে পুলিশ ১০০% পেশাদারিত্ব দেখিয়েছে। এরপর ১১ আগস্ট সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয় এবং মাত্র ৮ দিনের মাথায় আদালত রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন। বিচার পাওয়ার এই অভাবনীয় গতি দেখে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বেড়েছে।

ঘটনার পর থেকেই নড়াইলের সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। দোষী ব্যক্তির ফাঁসির দাবিতে নড়াইল-যশোর সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রায় ৯৯% মানুষেরই দাবি ছিল এই নরপিশাচের একমাত্র শাস্তি যেন হয় মৃত্যুদণ্ড। নড়াইলের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা রাজপথে নেমেছিলেন শিশু মাওয়ার খুনিকে শাস্তি দিতে। আজ আদালত চত্বরেও কয়েকশ মানুষ ভিড় জমায় শুধুমাত্র এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির সাক্ষী হতে।

গ্রেফতারের পর রবিউলকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল পুলিশ। রিমান্ড শেষে সে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। সে জানায়, লালসার বশবর্তী হয়েই সে জান্নাতুল মাওয়াকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়েছিল। জবানবন্দিতে সে হত্যার প্রতিটি মুহূর্তের বর্ণনা দেয়, যা শুনে উপস্থিত সবার গা শিউরে উঠেছিল। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসামির এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রায়কে ১০০% নির্ভুল করতে সহায়তা করেছে। রাজমিস্ত্রির ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা এই খুনি যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা নড়াইলবাসী এই ঘটনার আগে কল্পনাও করতে পারেনি।

রায় শোনার পর জান্নাতুল মাওয়ার বাবা-মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা বলেন, “আমার মেয়ে তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু এই রায়ের ফলে মাওয়ার আত্মা শান্তি পাবে।” এলাকাবাসীর দাবি, উচ্চ আদালতেও যেন এই রায় বহাল থাকে এবং খুব দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আজ দুপুর থেকেই আদালত চত্বরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। কয়েক স্তরের পুলিশি ব্যষ্টনী ভেদ করে যখন খুনি রবিউলকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, তখন উত্তেজিত জনতা তার ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে।

সবশেষে বলা যায়, ৫ বছরের শিশু হত্যার এই রায় নড়াইলের ইতিহাসে একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দ্রুত তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে আদালত বুঝিয়ে দিয়েছে যে, শিশুদের ওপর কোনো প্রকার সহিংসতা বরদাশত করা হবে না। এখন শুধু ঘাতক রবিউল শিকদারের দণ্ড কার্যকরের অপেক্ষা। নড়াইলের এই ছোট্ট জান্নাতুল মাওয়ার রক্ত যেন ভবিষ্যতে আরও শত শত শিশুকে নিরাপদ রাখার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

সম্পর্কিত নিবন্ধ