এইচ এম রাহুল, ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহের সবুজ চত্বরে আজ যেন এক চাঁদের হাট বসেছিল। মেধা আর স্বপ্নের সংমিশ্রণে এক আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (A+) প্রাপ্ত দুই শতাধিক কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঝিনাইদহ শহর শাখা। ‘মেধা, সততা ও দেশপ্রেমে গড়ি ইনসাফের বাংলাদেশ’—এই বলিষ্ঠ স্লোগানকে সামনে রেখে বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল ১০টায় শহরের প্রাণকেন্দ্র কুটুম কমিউনিটি সেন্টারে এই জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের পর যখন কৃতী শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হচ্ছিল, তখন হলভর্তি মানুষের করতালিতে এক অন্যরকম আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। শহর শাখার প্রায় ১০০% নেতাকর্মীর উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঝিনাইদহ শহর ছাত্রশিবিরের সভাপতি ওবাইদুর রহমান খান। প্রধান অতিথি হিসেবে মঞ্চ আলোকিত করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় মিডিয়া সম্পাদক হাফেজ মুজাহেরুল ইসলাম। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, পরীক্ষায় ভালো জিপিএ পাওয়া সাফল্যের মাত্র ২০% অংশ, বাকি ৮০% নির্ভর করে নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের ওপর। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “তোমরাই আগামীর বাংলাদেশের কর্ণধার। যদি তোমাদের মেধার সাথে সততার যোগফল ০ (শূন্য) হয়, তবে সেই মেধা জাতির কোনো কাজে আসবে না।” তিনি আরও যোগ করেন যে, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিষয়ে ১০০/১০০ প্রস্তুতি নিতে হবে এবং স্মার্ট প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শিখতে হবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রেটিনা মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল অ্যাডমিশনের সাবেক প্রধান পরিচালক ডা. কাজী কামরুল হাসান শিশির। তিনি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার গড়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী পাস করলেও মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। তাই নিজেকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে গড়ে তুলতে হবে যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্তত ৫০,০০০থেকে৬০,০০০ বেতনের চাকরিতে তোমরা অনায়াসেই প্রবেশ করতে পারো। এছাড়াও বিজিএমইএ (BGMEA)-এর স্ট্যান্ডিং কমিটি বিল্ডিং সিকিউরিটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কামরুল ইসলাম তার বক্তব্যে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের জিডিপিতে ১০% অবদান রাখতে পারে আমাদের তরুণ প্রজন্ম, যদি তাদের সঠিকভাবে গাইড করা যায়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখার সভাপতি ইউসুব আলী ও ঝিনাইদহ জেলা শিবিরের সভাপতি রিয়াজুর ইসলাম। তারা মেধাবী ছাত্রদের দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান। বক্তারা উল্লেখ করেন যে, জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই যুদ্ধ জয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘ সংগ্রামের শুরু মাত্র। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় দেশের শীর্ষ ৫% মেধাবীর তালিকায় জায়গা করে নিতে হলে এখন থেকেই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে সম্মাননা ক্রেস্ট, সুগন্ধি ফুল এবং মননশীল কিছু বই তুলে দেওয়া হয়। একেকটি উপহার সামগ্রীর প্যাকেট দেখে শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে এক দারুণ তৃপ্তির ছাপ লক্ষ্য করা গেছে। অনেক শিক্ষার্থী জানান, এই সম্মাননা তাদের আগামীর পথে চলার গতি অন্তত দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবে।
পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেন ঝিনাইদহ শহর শাখার সেক্রেটারি তানজিম বিন আলীম। তিনি ঘোষণা করেন যে, ছাত্রশিবির সবসময় মেধাবীদের পাশে ছিল এবং থাকবে। তারা মেধাবীদের শুধু সংবর্ধনাই দেয় না, বরং অস্বচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সময় বৃত্তির ব্যবস্থাও করে থাকে। এ বছরও তারা জেলার বেশ কিছু অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে ১০০০$ সমমূল্যের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে জানানো হয়। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মাঝে রিফ্রেশমেন্ট বা হালকা নাস্তার ব্যবস্থা ছিল, যেখানে হাইজিন বা স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি ১০০% নিশ্চিত করা হয়েছে বলে আয়োজকরা দাবি করেন।
সংবর্ধনা নিতে আসা এক শিক্ষার্থী আবেগী কণ্ঠে বলেন, “আমি অনেক জায়গায় সংবর্ধনা পেয়েছি, কিন্তু আজকের পরিবেশটা ছিল একদম আলাদা। বড় ভাইদের কথা শুনে মনে হলো, শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়াই জীবনের শেষ কথা নয়, একজন ভালো মানুষ হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি।” অভিভাবকদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস। তারা মনে করেন, এ ধরনের অনুষ্ঠান কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করে তুলবে। প্রায় ৩ ঘণ্টা স্থায়ী এই অনুষ্ঠানটি দুপুর ১টার দিকে দোয়ার মাধ্যমে শেষ হয়। ঝিনাইদহ শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অভিভাবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এই আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ছাত্রশিবিরের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অনুরোধ জানান।
















