চুয়াডাঙ্গায় প্রান্তিক পেশাজীবীদের জীবন বদলের নতুন মিশন: ১০ দিনের প্রশিক্ষণ শুরু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মোঃ মিনারুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা:

চুয়াডাঙ্গার অবহেলিত ও প্রান্তিক পেশাজীবীদের ভাগ্যোন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। যারা সমাজের মূলধারার আড়ালে থেকে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, সেইসব নাপিত, কামার, কুমার ও দর্জিদের দক্ষতা বাড়াতে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় শুরু হয়েছে বিশেষ এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। ‘বাংলাদেশের প্রান্তিক পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন (২য় ফেইজ)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই ১০ দিনব্যাপী পেশাভিত্তিক ‘সফট স্কিলস’ প্রশিক্ষণ বুধবার (১৯ আগস্ট) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেকে মনে করছেন, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাধারণ শ্রমিকদের পেশাগত মান ১০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব।

বুধবার বেলা ১১টায় চুয়াডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণের শুভ উদ্বোধন করা হয়। উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় যৌথভাবে এই চমৎকার আয়োজনটি বাস্তবায়ন করছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, শুধু কারিগরি জ্ঞান থাকলেই হয় না, গ্রাহকের সাথে ব্যবহার এবং ব্যবসার ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক না জানলে জীবনে উন্নতি করা কঠিন। জেলা প্রশাসক আরও যোগ করেন যে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয় অন্তত ২০% থেকে ৩০% বাড়ানোই সরকারের মূল লক্ষ্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই ১০ দিনের শিক্ষা অংশগ্রহণকারীদের ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী করে তুলবে।

প্রশিক্ষণ কর্মশালাটিতে মূলত চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রান্তিক পেশাজীবীরা অংশ নিয়েছেন। ‘সফট স্কিলস’ বা আচরণগত দক্ষতা অর্জনের এই কোর্সে শেখানো হচ্ছে কীভাবে একজন পেশাজীবী তার গ্রাহকের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন, কীভাবে ব্যবসার হিসাব-নিকাশ করবেন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে নিজের পেশাকে সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানায়, অনেক সময় দেখা যায় দক্ষ কারিগর হওয়া সত্ত্বেও সঠিক যোগাযোগের অভাবে তারা ন্যায্য মূল্য পান না। এই প্রশিক্ষণের ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং তারা নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে আরও সচেতন হবেন। এতে করে স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রায় ১০% থেকে ১৫% বাড়তি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সরকারি এই প্রকল্পে আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের জন্য যাতায়াত ভাতা ও ক্ষুদ্র অনুদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতিটি অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৫,০০০ টাকা থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারেন, যা ডলারের হিসেবে প্রায় ৪২থেকে৮৫পর্যন্ত হতে পারে। এই সামান্য পুঁজি অনেক প্রান্তিক মানুষের জন্য বড় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে যারা অর্থাভাবে নিজের ছোট দোকানটি মেরামত করতে পারছেন না, তারা এই টাকা দিয়ে নতুন যন্ত্রপাতি বা আসবাবপত্র কিনতে পারবেন। সরকারের এই সরাসরি বিনিয়োগ গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে বদলে দিচ্ছে।

প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া একজন কামার জানান, তিনি কয়েক যুগ ধরে লোহা পিটিয়ে দা-বটি বানালেও কোনোদিন এমন প্রশিক্ষণের সুযোগ পাননি। তিনি বলেন, “আমরা আগে জানতাম না যে গ্রাহকের সাথে ভালো ব্যবহার করলে ব্যবসা এত দ্রুত বাড়ে। এখন মনে হচ্ছে আমার ব্যবসার আয় ৫০% বাড়ানো সম্ভব।” এই কথা থেকেই বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের মনে এই প্রকল্প কতটা আশার আলো জ্বালিয়েছে। প্রশিক্ষণের প্রতিটি সেশনে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি ছিল ১০০%। প্রশিক্ষকরাও অত্যন্ত সহজ ভাষায় অংশগ্রহণকারীদের নানা বিষয় বুঝিয়ে দিচ্ছেন যাতে তাদের বুঝতে কোনো কষ্ট না হয়।

উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা চুয়াডাঙ্গার আরও বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছি। সমাজসেবা অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার সমাজিক সুরক্ষা খাতে বাজেটের বড় একটি অংশ বরাদ্দ রেখেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র্যের হার ৫% এর নিচে নামিয়ে আনা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরি করা। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা যদি নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকেন এবং নির্দেশনাবলী মেনে চলেন, তবে তারা ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরের অন্যতম কারিগর হিসেবে গড়ে উঠবেন।

প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী। কারণ কৃষি প্রধান এই এলাকায় কৃষি যন্ত্রপাতির সাথে যুক্ত কামার বা সাধারণ গ্রামীণ কারিগরদের গুরুত্ব অপরিসীম। কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, প্রশিক্ষণ শেষে এই পেশাজীবীদের একটি বড় অংশকে ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় আনা হবে। সেক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার ২% এর মতো সামান্য রাখা হতে পারে যাতে তারা সহজেই ঋণের টাকা শোধ করতে পারেন। উপজেলা প্রশাসন মনে করে, এভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে চুয়াডাঙ্গা জেলার বেকারত্ব অনেকাংশে দূর হবে এবং মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখবে।

পরিশেষে বলা যায়, ১০ দিনব্যাপী এই সফট স্কিলস প্রশিক্ষণ শুধুমাত্র একটি গতানুগতিক প্রোগ্রাম নয়, বরং এটি চুয়াডাঙ্গার মেহনতি মানুষের স্বপ্ন পূরণের সিড়ি। জেলা প্রশাসনের এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শেষে জেলা প্রশাসক প্রশিক্ষনার্থীদের হাতে শিক্ষা উপকরণ তুলে দেন। সবার চোখেমুখে তখন ছিল সফল হওয়ার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার এই উদ্যোগ সারাদেশে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে সবাই বিশ্বাস করেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ