বারবার ডায়েট করে ক্লান্ত? ওজন কমাতে জাদুর মতো কাজ করবে ‘ইনটিউটিভ ইটিং’

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ওজন কমানোর চক্করে পড়ে আমরা কত কিছুই না করি। সকালে লেবু-জল থেকে শুরু করে রাতে কিটো ডায়েট—তালিকাটা বেশ লম্বা। কিন্তু সমস্যা হলো, ডায়েট চার্ট ছাড়লেই ওজন আবার রকেটের গতিতে বাড়তে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কঠোর ডায়েট করা প্রায় ৯০% মানুষই এক বছরের মধ্যে তাদের আগের ওজনে ফিরে যান। এর সাথে যোগ হয় ডিপ্রেশন আর তীব্র অপরাধবোধ। এই দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি দিতে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এখন ‘ইনটিউটিভ ইটিং’ বা শরীরের ভাষা বুঝে খাওয়ার কথা বলছে। এটি কোনো সাময়িক ডায়েট নয়, বরং এটি একটি জীবন দর্শন যা আপনাকে খাবারের সাথে এক সুস্থ সম্পর্ক গড়তে শেখাবে।

সহজ কথায় ইনটিউটিভ ইটিং মানে হলো নিজের শরীরের প্রাকৃতিক ক্ষুধা আর তৃপ্তির সংকেত চিনে খাবার গ্রহণ করা। এখানে কোনো খাবারকে ‘শত্রু’ বা ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে আলাদা করা হয় না। অনেকে ভাবেন ওজন কমাতে হলে বিরিয়ানি বা মিষ্টির দিকে ১০০% তাকাতে মানা। কিন্তু ইনটিউটিভ ইটিং বলছে ঠিক উল্টো কথা। আপনি যখন কোনো নির্দিষ্ট খাবারকে নিষিদ্ধ ভাবেন, তখন সেটির প্রতি মনের আকর্ষণ ৫০০ গুণ বেড়ে যায়। এই পদ্ধতি শেখায় কখন শরীর সত্যি সত্যি জ্বালানি চাচ্ছে আর কখন আমরা কেবল শখের বসে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে খাচ্ছি। এটি শরীরের ভেতরকার জৈবিক ঘড়িকে আবার সচল করার একটি বিজ্ঞানসম্মত চেষ্টা।

এই জীবনশৈলী পরিচালনার ১০টি বিশেষ মূলনীতি রয়েছে। প্রথমত, আপনাকে ডায়েট করার সেই পুরোনো কঠোর মানসিকতা মন থেকে ১০০% মুছে ফেলতে হবে। নিজের ক্ষুধাকে সবসময় সম্মান জানাতে হবে। শরীর যখন পুষ্টি চাইবে, তখন তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। আপনি যদি ক্ষুধা চেপে রাখেন, তবে পরে একবারে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেশি খেয়ে ফেলার সম্ভাবনা থাকে, যা শরীরের জন্য ২ থেকে ৩ গুণ বেশি ক্ষতিকর। এছাড়া আমাদের মনের ভেতরে একজন ‘খাদ্য পুলিশ’ থাকে, যে সারাক্ষণ নেতিবাচক কথা বলে। এই পুলিশকে থামিয়ে দিতে হবে এবং প্রতিটি খাবারের স্বাদ ও গুণাগুণকে গুরুত্ব দিয়ে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে।

খাবার খাওয়ার সময় শুধু পেট ভরালেই হবে না, মনে তৃপ্তি থাকাও সমান জরুরি। সুন্দর পরিবেশে বসে নিজের পছন্দের খাবার উপভোগ করে খাওয়া সুস্থতার অর্ধেক। খাওয়ার মাঝে মাঝে একটু বিরতি নিয়ে নিজের পেটকে জিজ্ঞাসা করুন—সে কি সত্যিই ভরেছে? আরামদায়ক অনুভূতির পর খাওয়া থামিয়ে দেওয়াটাই হলো আসল কৌশল। অনেক সময় আমরা রাগ, দুশ্চিন্তা, একাকিত্ব বা বিরক্তি সামলাতে খাবারের আশ্রয় নিই। একে বলা হয় ‘ইমো- ইটিং’। ইনটিউটিভ ইটিং শেখায় আবেগের আসল কারণ খুঁজে বের করে সেটির সমাধান করতে, খাবার দিয়ে মনের শূন্যস্থান পূরণ করতে নয়।

নিজের শরীরকে সম্মান করা এই পদ্ধতির অন্যতম ভিত্তি। মনে রাখতে হবে, সবার শারীরিক গঠন এক হবে না এটিই প্রকৃতির নিয়ম। নিজের বংশগতি বা স্বাভাবিক শারীরিক কাঠামো নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগা বন্ধ করতে হবে। ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। কেবল ক্যালরি পোড়ানোর জন্য বা ৫থেকে১০ ডলার জিমের পেছনে খরচ করার চিন্তায় ঘাম ঝরানো নয়, বরং শরীরকে চাঙা ও সতেজ রাখতে শরীরচর্চা উপভোগ করতে হবে। স্বাস্থ্য আর রুচির সমন্বয় করে নমনীয় পুষ্টিবিধান মেনে চলাই হলো আসল কথা। একদিন যদি একটু অগোছালো খাওয়া হয়েও যায়, তবে সেটা নিয়ে সারাদিন মন খারাপ করে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ইনটিউটিভ ইটিং মেনে চলেন তাদের রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকার হার অন্যদের চেয়ে প্রায় ২০% বেশি থাকে। এটি কেবল শারীরিক উন্নতি নয়, বরং মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে। ডায়েট চার্ট ফলো করার যে মানসিক চাপ বা লজিস্টিক ঝক্কি থাকে, সেটি থেকে মুক্তি পেলে মানুষের সৃজনশীলতাও বৃদ্ধি পায়। এতে ইটিং ডিজঅর্ডারের ঝুঁকি কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মনের ভারসাম্য বজায় থাকে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, এই পদ্ধতি সবার জন্য একইভাবে কাজ নাও করতে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই কোনো গুরুতর ইটিং ডিজঅর্ডার আছে বা যারা এডিএইচডি (ADHD) কিংবা অটিজমের মতো সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় তাদের শরীরের সংকেতগুলো মস্তিষ্কে পরিষ্কারভাবে পৌঁছায় না। সুস্থ থাকার মূল মন্ত্র হলো নিজের শরীরকে বোঝা ও ভালোবাসা। নিখুঁত কোনো ডায়েট চার্ট অনুসরণ করার চেয়ে নিজের শরীরের ভাষা বুঝতে পারাটাই হলো প্রকৃত সুস্থতা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ