ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ প্রায় শেষ দিকে। ৩০ বছর মেয়াদী এই ঐতিহাসিক চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর বিলিয়া (BILIA) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন চুক্তি হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং ন্যায্য। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে যে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বা পানি প্রাপ্তির নিশ্চিত ধারা ছিল, তা বর্তমান বাস্তবতায় আবার ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা না করলে এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঠিক ব্যবহার না করলে বাংলাদেশ তার ন্যায্য পাওনা থেকে বারবার বঞ্চিত হতেই থাকবে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তিনি বলেন, আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে যাচ্ছেন। সেখানে তিনি গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান ও জনগণের অধিকারের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরবেন বলে আমরা আশা করছি। মন্ত্রী মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে সুরক্ষার কোনো জোরালো ধারা না থাকায় বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে আমাদের স্বার্থ প্রায় ১০০% সুরক্ষিত ছিল। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে সই হওয়া বিভিন্ন সমঝোতা স্মারকে সেই অধিকারগুলো একে একে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানান, বাংলাদেশের মানুষের আবেগ আর স্বার্থকে সম্মান করেই ভারতের সাথে বন্ধুত্ব এগিয়ে নিতে হবে।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল ভয়াবহ কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি তথ্য দিয়ে দেখান যে, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ২৭টি সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যে ১৫ বারই বাংলাদেশ চুক্তিতে উল্লিখিত ন্যূনতম পানিপ্রবাহ পায়নি। ১৯৯৬ সালের চুক্তির ফলে বাংলাদেশের পানির হিস্যা আগের তুলনায় প্রায় ৬.৫২% কমে গেছে। ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার প্রায় ৭০% অববাহিকা অবস্থিত হওয়ায় উজানে ভারত অসংখ্য সেচ প্রকল্প তৈরি করেছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে না পারলে ভবিষ্যতে কৃষি ও পরিবেশের সংকট আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান চুক্তিতে তথ্য জানার কোনো অধিকার রাখা হয়নি। ভারত ফারাক্কা পয়েন্টে কতটুকু পানি ছাড়ছে বা তাদের জলাধারে কী পরিমাণ পানি জমা আছে, সেই সঠিক তথ্য পাওয়ার কোনো স্বচ্ছ ব্যবস্থা নেই। অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান জানান, নতুন চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা বা ‘ডিসপিউট সেটেলমেন্ট ক্লজ’ অবশ্যই থাকতে হবে। এছাড়া পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫৪টি বড় নদীর নব্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যার প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ছে।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বের ঠিকই, কিন্তু পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বাংলাদেশের প্রায় ১০০% মানুষই চায় গঙ্গার পানির সমস্যার একটি স্থায়ী ও ন্যায্য সমাধান। উজানের দেশ হিসেবে ভারত যদি একতরফাভাবে পানি আটকে রাখে, তবে আমাদের আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয় নিতে দ্বিধা করা উচিত নয়। চুক্তিতে এমন আইনি কাঠামো থাকতে হবে যেন কোনো পক্ষ চাইলেই পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশনের নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি।
সেমিনারে ইমেরিটাস অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পানির চাহিদা ঠিক কতটুকু, তার একটি সঠিক ডিজিটাল ডাটাবেজ আগে তৈরি করতে হবে। এরপর সেই বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের সাথে দরকষাকষি করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক আলোচনার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত তথ্য আর আইন দিয়ে নিজেদের দাবি আদায় করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি খাতের অন্তত ১০% থেকে ১২% উন্নয়ন সরাসরি গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই এই চুক্তির প্রতিটি শর্ত হতে হবে স্বচ্ছ এবং কোনো অস্পষ্টতা থাকা চলবে না।
পরিশেষে বলা যায়, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি বাংলাদেশের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন। ৩০ বছরের এই মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই নীতিনির্ধারকদের সঠিক ও সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের দেওয়া সুপারিশগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করলে ভারতও বুঝতে পারবে যে, বাংলাদেশ তার অধিকার আদায়ে এখন অনেক বেশি সচেতন। ন্যায্য পানির অধিকার ফিরে পাওয়া মানেই দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি আর লাখ লাখ কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন করা। তাই আগামী দিনে ভারতের সাথে পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনার প্রতিটি পর্যায় হওয়া উচিত জনগণের সামনে উন্মুক্ত এবং সম্পূর্ণ জবাবদিহিতামূলক।
















