বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মতে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এই সরকার ‘মোটা দাগে’ ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, জামায়াত মনে করে সরকার এখন ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট শাসনামলের পথেই হাঁটতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই কড়া মন্তব্য করেন। ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরকারের ব্যর্থতার নানা দিক তুলে ধরেন এবং ৮ দফা দাবি পেশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা ‘কমিটমেন্ট’ রক্ষা করতে পারেনি। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, সরকার এখন ফ্যাসিস্টদের পথেই পা বাড়াচ্ছে এবং এর পরিণতিও সেই দিকেই যাচ্ছে। জামায়াতের মতে, গত ১৮০ দিনে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় যে সক্ষমতা ও সদিচ্ছা দেখানোর কথা ছিল, তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। বিশেষ করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদের প্রতি সরকারের দৃশ্যমান অনীহা রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণের যে সংস্কৃতি আগে ছিল, তা এখনো কাটেনি বরং আরও জেঁকে বসছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করে জামায়াত জানায়, দেশে বর্তমানে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে কোনো কার্যকর বা পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নেই। শিল্প কারখানায় গ্যাসের অভাব এবং বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলএনজি আমদানি বা নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার নয়। তারা প্রশ্ন তোলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সরকারের কৌশলগত ‘ফুয়েল রিজার্ভ’ পরিকল্পনা কোথায়? এই ব্যর্থতার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি দেশের অর্থনীতিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামায়াত। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। গত ৬ মাসে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রায় ০% বা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে আস্থার চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট এবং বড় বড় খেলাপি ঋণ আদায়ের কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। জামায়াতের অভিযোগ, আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছেন এবং উচ্চ সুদের চাপে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করতে পারছেন না। প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে দলীয় পরিচয়কে ১০০ শতাংশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তারা দাবি করে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও সরকার সফল হতে পারেনি বলে জামায়াত মনে করে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা বা তার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটিও ঝুলে আছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তার বলিষ্ঠ অবস্থান তুলে ধরতে পারেনি। জামায়াতের মতে, গুম প্রতিরোধে যে নতুন আইন করা হয়েছে, সেখানেও অনেক ফাঁক রয়ে গেছে। তারা মনে করে, এই আইনের মাধ্যমে গোপনে আটক বা অস্বীকৃত হেফাজতে রাখার সুযোগ থেকে যাচ্ছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
সবশেষে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ৮টি সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়। এসব দাবির মধ্যে অন্যতম হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করা। সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজ দ্রুত শেষ করা এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে দৃশ্যমান সংস্কার সম্পন্ন করা। নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের বদলে মেধা ও যোগ্যতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং গুম প্রতিরোধ আইনের সংশোধনী আনার দাবি জানায় দলটি।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খানসহ আরও অনেক কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতের এই কঠোর অবস্থান দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের ৬ মাস পূর্তিতে জামায়াতের এই ‘ব্যর্থতার সনদ’ আগামী দিনে রাজনৈতিক মেরুকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই সমালোচনাকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
















