সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষের আর্তনাদ কোনো টাকা দিয়েই মোচন করা সম্ভব নয়। তবুও বিপদের দিনে অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার। চুয়াডাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চুয়াডাঙ্গা সার্কেলের উদ্যোগে এই অনুদান প্রদান করা হয়। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট ২০২৬) সকালে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মোট ৮২ লাখ টাকার অনুদান বিতরণ করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এই অর্থ পেয়ে তাদের কষ্টের দিনে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে চেকগুলো তুলে দেন। এসময় ২০টি পরিবারের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যারা বিভিন্ন সময়ে চুয়াডাঙ্গার সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তাদের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছেন অথবা নিজেরাই শারীরিক সক্ষমতা হারিয়েছেন। জেলা প্রশাসক একেক করে সবার হাতে চেক তুলে দেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। প্রশাসনের এমন উদ্যোগে উপস্থিত অনেকের চোখেই জলের রেখা দেখা যায়। তারা জানান, এই টাকা হয়তো মৃত মানুষকে ফিরিয়ে দেবে না, কিন্তু পরিবারের টিকে থাকার লড়াইয়ে ১০০% সাহায্য করবে।
চেক হস্তান্তর শেষে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “সড়কে মূল্যবান প্রাণ ঝরে যাওয়া আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে বেপরোয়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে চুয়াডাঙ্গায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার প্রায় ৪০% বেড়েছে।” তিনি মোটরসাইকেল আরোহীদের অবশ্যই হেলমেট পরার এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার নির্দেশ দেন। জেলা প্রশাসক স্পষ্ট করে বলেন যে, লাইসেন্সবিহীন ও অবৈধ কোনো মোটরসাইকেল রাস্তায় চলতে দেওয়া হবে না। যারা আইন অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।
সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, আমাদের দেশের চালকদের মধ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। দক্ষ চালক তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন। এছাড়া সাধারণ মানুষের অসচেতনতাও দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। তিনি উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে চালক ও পথচারী উভয়েই ৯৯% ক্ষেত্রে আইন মেনে চলে, যার ফলে দুর্ঘটনার হার অনেক কম। আমাদের দেশেও সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রশাসনের একার পক্ষে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় যদি সাধারণ মানুষ সহযোগিতা না করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিআরটিএ-র কর্মকর্তারা জানান, সড়ক পরিবহন আইনের আওতায় এই অনুদান প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যেন সহজে এই সাহায্য পায়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। তারা আরও জানান, ভবিষ্যতে এই ধরনের সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রতিনিধি মিনারুল ইসলাম জানান, এই ২০টি পরিবারের মধ্যে কেউ হারিয়েছেন তার বাবাকে, কেউবা একমাত্র ছেলেকে। আবার কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা হারিয়ে এখন পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের জন্য এই ৮২ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান একটি বড় অবলম্বন হিসেবে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এ ধরনের অনুদান শুধু আর্থিক সাহায্য নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি বড় প্রমাণ। তবে তারা একই সাথে দাবি জানিয়েছেন যেন সড়কের অবকাঠামো আরও উন্নত করা হয় এবং যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ হাটবাজার ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধে প্রশাসন আরও বেশি সক্রিয় হয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সড়ককে নিরাপদ করার শপথ নেওয়ার মাধ্যমেই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
পরিশেষে, চুয়াডাঙ্গার এই উদ্যোগ সারা দেশের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু শাস্তি নয়, সচেতনতা এবং দুর্ঘটনার পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও অত্যন্ত জরুরি। আজকের এই ৮২ লাখ টাকার সহায়তা ২০টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর পাশাপাশি অন্যদেরও সড়ক আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সড়ক হোক নিরাপদ, প্রতিটি প্রাণ ফিরে আসুক তার পরিবারের কাছে এই প্রত্যাশাই সবার।
















