যশোরে প্রেসক্লাব সদস্যের মার্কেট ও জমি জবরদখল: খড়কির জাহাঙ্গীরের দাপটে দিশেহারা ব্যবসায়ী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র মুজিব সড়কে এক ভয়াবহ জবরদখলের ঘটনা এখন শহরবাসীর মুখে মুখে ‘হট কেক’-এ পরিণত হয়েছে। প্রেসক্লাব যশোরের আজীবন সদস্য ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী মোঃ হাবিবুর রহমানের দীর্ঘ মেয়াদে লীজ নেওয়া জমি ও সেখানে নবনির্মিত মার্কেটটি গায়ের জোরে দখল করে নিয়েছে খড়কি এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী নাজমুল কাদির জাহাঙ্গীর ও তার বাহিনী। বর্তমানে ঐ ব্যবসায়ী ও তার কর্মচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সন্ত্রাসীদের ভয়ে হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না, যার ফলে তিনি আর্থিক ও মানসিকভাবে ১০০% ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, রায়পাড়ার বাসিন্দা শেখ আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে মোঃ হাবিবুর রহমান (৪৮) শহরের মুজিব সড়কে অবস্থিত সাবেক সোনালী ব্যাংক ভবনের ৫৬ শতক জমি বৈধভাবে লীজ নেন। সেখানে তিনি ছয়টি দোকান ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং ইতিমধ্যে প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে কাজ শুরু করেন। কিন্তু গত ২৩ জুলাই দুপুর ২টার দিকে হঠাৎ করেই খড়কির নাজমুল কাদির জাহাঙ্গীর তার একদল ক্যাডার নিয়ে নির্মাণাধীন মার্কেটে চড়াও হয়। তারা কাজ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং সেখানে থাকা নির্মাণ শ্রমিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তাড়িয়ে দেয়। সন্ত্রাসীরা এসময় দোকানের মালামাল ভাঙচুর করে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।

ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, ঐ জমিটি তিনি প্রথমে দুই বছরের জন্য এবং পরে আরও এক বছরের জন্য শর্তসাপেক্ষে ভাড়া নিয়েছিলেন। সংস্কার কাজ প্রায় শেষের দিকে থাকলেও জাহাঙ্গীরের বাধার মুখে এখন সবকিছু থমকে গেছে। গত ২৭ জুলাই জাহাঙ্গীর মুঠোফোনের মাধ্যমে হাবিবুর রহমানের কর্মচারী রুবেলকে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেয়। তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে, সংস্কার কাজের ধারেকাছে গেলে তার পরিনাম হবে ভয়াবহ। এই ভয়ে বর্তমানে কোনো শ্রমিক বা কর্মচারী সেখানে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, দখলদার জাহাঙ্গীর অত্যন্ত চতুর। সে আগে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকলেও এখন খোলস পাল্টে বিএনপির নামধারী কিছু মাস্তানকে সাথে নিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করছে। বর্তমানে ঐ জমিতে হাবিবুর রহমানের কিনে রাখা ইট, বালি ও সিমেন্ট ব্যবহার করেই জাহাঙ্গীর নিজের মতো করে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে এই দখলদারিত্ব পাহারা দিচ্ছে এলাকার চিহ্নিত ক্যাডার মাসুদ, রূপম ও রনি। এদের মধ্যে মাসুদ হলো নজরুলের ছেলে, রূপম সাবেক আওয়ামী লীগ ক্যাডার হাসানের ছেলে এবং রনি আনোয়ার গাজীর ছেলে। এরা সারাদিন সেখানে বসে থাকে এবং অপরিচিত কাউকে ভিড়তে দেয় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহাঙ্গীরের প্রতারণার জাল অনেক গভীরে বিস্তৃত। এর আগে সে জমির মালিক সাইদুর রহমান ও সুমনার সাথে যোগসাজশ করে ষষ্ঠীতলার শুভ এন্টারপ্রাইজের মালিক শুভর কাছ থেকে জমি বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। পরে জমি না দিয়ে তাকে মাসের পর মাস ঘোরানো হয়। দীর্ঘ ঝামেলার পর সেই টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করা হলেও শুভ তার পুরো পাওনা বুঝে পেয়েছেন কিনা তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে এই চক্রটি ঝিকরগাছা এলাকার একটি পক্ষের সাথে প্রায় $৭ কোটি টাকার (সাত কোটি) একটি গোপন চুক্তি করার পায়তারা করছে। জমিটি অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করার এই ষড়যন্ত্র জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান একজন নিরীহ মানুষ হিসেবে পরিচিত। প্রেসক্লাব যশোরের আজীবন সদস্য হিসেবে তার একটি সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসীদের পেশিশক্তির কাছে তিনি এখন অসহায়। পঙ্গু হাসপাতালের সামনের এই বিশাল সম্পদটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তিনি ব্যবসায়িকভাবে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে এই চক্রটি পুরো জমিটি অবৈধভাবে বিক্রি করে দিয়ে গা ঢাকা দেবে।

বর্তমানে পুরো মার্কেট এলাকা সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, দিনের আলোতে এভাবে একজন মানুষের বৈধভাবে নেওয়া জমি দখল হয়ে যাওয়া যশোরের আইনশৃঙ্খলার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ এখন প্রকাশ্যে এই জুলুমের বিচার চাইছে। হাবিবুর রহমানের মতো একজন লড়াকু ব্যবসায়ী কেন আজ চুপ থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। যশোর শহরের মতো জায়গায় এমন বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধে তারা জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এদিকে জাহাঙ্গীরের এই কর্মকাণ্ডের কারণে যশোরের সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যেও এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একদল নতুন দখলবাজ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যদি এই দখলদারদের এখনই থামানো না যায়, তবে শহরের অনেক বৈধ সম্পদই বেহাত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। হাবিবুর রহমানের এই ৫৬ শতক জমির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে, আর জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ