ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৭.০৮.২৬ তারিখে শৈলকুপা থানার অফিসার ও ফোর্সের সমন্বয়ে গঠিত একটি চৌকস দল বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ১৩ জন মাদকসেবীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের এই ঝটিকা অভিযানে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন স্বস্তি ফিরেছে, তেমনি মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সমাজ থেকে ১০০% মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই লড়াই চলবে।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন— ১। দলিলপুর গ্রামের মৃত অজেদ শেখের ছেলে আবুদ্ল আলীম (৩৫), ২। একই গ্রামের সোনা উল্লাহ শেখের ছেলে রজব আলী শেখ (৪০), ৩। মিনগ্রামের অমর বিশ্বাসের ছেলে শহিদ বিশ্বাস (৫০), ৪। কুমিড়াদহ গ্রামের মোঃ উজ্জল শেখ (৩৫), ৫। হাটফাজিলপুর এলাকার চিরু খন্দকারের ছেলে রাজু খন্দকার (২৫), ৬। গোড়ামারা গ্রামের গোলাম কুতুব বিশ্বাসের ছেলে মোঃ ফারুক বিশ্বাস (২৪), ৭। নতুনভুক্ত মালিথিয়া গ্রামের টিপু সুলতানের ছেলে মোঃ মুন্না (১৯), ৮। একই এলাকার মুক্তার শেখের ছেলে দিনার হোসেন (১৯), ৯। গোবিন্দপুর গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে মোঃ মাহামুদ হাসান (২১), ১০। ঝাউদিয়া গ্রামের মোঃ হান্নান শেখের ছেলে মোঃ রাব্বি শেখ (১৯), ১১। একই গ্রামের মোঃ শহিদুল ইসলামের ছেলে মোঃ সাগর হোসেন (২৬), ১২। মিনগ্রামের ইসরাইল শেখের ছেলে মোঃ আলমাছ শেখ (৩০) এবং ১৩। একই গ্রামের ইসরাইল বিশ্বাসের ছেলে আকাশ বিশ্বাস (৩০)।
পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জের নির্দেশে পুলিশের বিশেষ টিম বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। অভিযানে মাদক সেবনরত অবস্থায় এই ১৩ জনকে আটক করা হয়। আটক করার পর তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাদক সেবনের কথা স্বীকার করে তারা। এরপর পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারায় মামলা রুজু করে। পুলিশের এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ মনে করে, এ ধরনের ছোট ছোট অভিযান বড় অপরাধ দমনে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
গ্রেফতারকৃতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে অপরাধের ধরন অনুযায়ী আসামিদের ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, অপরাধীদের মধ্যে কয়েকজনকে চার মাস এবং বাকিদের ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ের পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালতের এই রায়কে এলাকার সচেতন মহল সাধুবাদ জানিয়েছে। তারা মনে করেন, দ্রুত বিচার ও সাজা হলে এলাকায় অপরাধ প্রবণতা কয়েক গুণ কমে আসবে।
শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা এই অভিযানের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য দেন। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে রাতদিন কাজ করছি। এই ১৩ জন মাদকসেবীকে গ্রেফতার করা আমাদের নিয়মিত অভিযানেরই অংশ। আমাদের লক্ষ্য হলো শৈলকুপা থেকে ১০০ শতাংশ মাদক নির্মূল করা। কোনো মাদকসেবী বা বিক্রেতাকে ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীদের জন্য আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় থাকবে। সামনের দিনগুলোতে আরও কঠোর অভিযান চালানো হবে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি করে না, বরং পুরো পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই মরণনেশার দিকে ধাবিত হওয়ায় সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। মাদক সেবনের জন্য টাকার জোগান দিতে গিয়ে অনেকেই চুরি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই মাদকসেবীদের আইনের আওতায় এনে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া জরুরি। পুলিশ জনগণের বন্ধু হিসেবে কাজ করতে চায় এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। এই অভিযানে পুলিশের প্রায় ২৫ জন সদস্য সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন এবং এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তারা অভিযানটি সফল করেন।
বর্তমানে ঝিনাইদহের এই অঞ্চলে মাদকবিরোধী প্রচারণাও জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মিলে পাড়া-মহল্লায় সচেতনতামূলক সভা করছেন। মাদক নির্মূলে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছে পুলিশ। যদি কোনো এলাকায় মাদক কেনাবেচা বা সেবনের খবর পাওয়া যায়, তবে তাৎক্ষণিক থানা পুলিশকে অবহিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। শৈলকুপা থানার এই সফল অভিযানের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে যে, পুলিশ সক্রিয় থাকলে সমাজ থেকে অনৈতিক কাজ দূর করা সম্ভব।
















